হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম এবং সকল মানবজাতির প্রতি – ১ম পর্ব

মনে করুন আপনি একজন এমবিএ (মাস্টার্স অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) সনদধারী। আপনার নামের সাথে ’এমবিএ’ সনদটি তথা ডিগ্রিটি শোভা পাচ্ছে। ভালো চাকুরী কিংবা ব্যবসা করছেন। বিবাহিত। ধরা যাক আপনার একটি সন্তান হল। সন্তানের নাম রাখার সময় আপনার ইচ্ছা হল আদরের সন্তানের নামের পাশে আপনার ’এমবিএ’ সনদটিও থাকবে! অসুবিধা কী? আপনি ’…..’ ধর্মের মানুষ তাই সন্তানের নাম যদি ধর্মানুযায়ী হতে পারে তবে আপনার ঔরসজাত সন্তানের নামের শেষে আপনার অর্জিত সনদটি থাকলে দোষ কোথায়, তাই না? কিন্তু আপনি এমনটি করবেন না। বলবেন, ’এমবিএ’ সনদটি আপনার সাধনার ফসল এবং এর প্রমাণও (বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্র) আপনার কাছে আছে। সন্তান যদি বড় হয়ে সনদটি অর্জন করতে পারে তবেই তার নামের পাশে ’এমবিএ’ শোভা পাবে। এটি যদি সত্যি হয় তবে আমরা কীভাবে আমাদের নামের শেষে ঠাকুর কিংবা বড়ুয়া কিংবা রোজারিও কিংবা খান ইত্যাকার পদবী যোগ করে বিভিন্ন ধর্মে ভাগ হয়ে যাই? আপনি যে নিজেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম বা অন্য কোন ধর্মের লোক ভাবছেন কোন প্রমাণ কি আছে? সন্তানের নাম রাখার আগে আকাশ থেকে কি কোন ধর্মের সনদপত্র আসে যে সন্তানটি অমুক ধর্মের? হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম কিংবা বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের ঘরে জন্মগ্রহণ করে যদি সেই ধর্মের লোক হওয়া যায় তবে একজন এমবিএ কিংবা চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলীর ঘরে জন্ম নিলে কেন সেই সব পদবীর অধিকারী হওয়া যাবে না? এটা গায়ের জোরে ধর্মান্তকরণ নয় কি?

একটা শিশুর কোন ধর্ম থাকে না। তাকে ধর্মান্তকরণ করা হয়। মনে রাখা ভাল গায়ের জোরে একমাত্র গুন্ডা কিংবা বদমাশ হওয়া যায় কিন্তু সত্যের নাগাল পাওয়া যায় না। মানুষের মাধ্যমে পৃথিবীতে আপনার আগমন, মানুষের কোলাহলে বিচরণ আবার মানুষ থেকে বিছিন্ন হয়ে যেখান থেকে এসেছেন সেখানে একাকী প্রস্থান। কেন? তবে আপনি কোথা হতে আসলেন আবার কোথায় যাবেন কখনো চিন্তা করেছেন কি? দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে জৈবিক চাহিদা মেটানোর জন্য এ পৃথিবীতে আপনি কত কী-ই না করে বেড়াচ্ছেন কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন আসলে আপনি ”কে”? তিলে তিলে কলুর বলদের মত খেটে পায়ে হাঁটা যুগের পৃথিবী থেকে আমরা এখন রকেট যুগে চলে এসেছি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের হাজারো শাখা খুলে নিমজ্জিত আছি নতুন আবিষ্কারের নেশায়। নিজেকে পরিবর্তন না করে মেতে আছি পৃথিবীকে পরিবর্তনের নেশায়। অথচ হাজার বছর আগে বাঘ যেভাবে হরিণ শিকার করে খেত এখনো সেভাবেই খায়, ঘুমায় এবং এক সময় বনের মাঝে হারিয়ে যায়। আমাদের কী হল যে আমরা কেউ একশ জন থাকার মত একটা প্রাসাদ দখল করে থাকি চার-পাঁচজন আর কারো থাকার ঠিকানা হয় রাস্তায়! জন্তুরা সবাই বনের ভেতর সহাবস্থান করতে পারল আর আমরা বিশ্বায়নের নামে, ধর্মের নামে, ছোওয়াবের নামে, স্বর্গে থাকার নামে, শান্তি আনয়নের নামে বোমা মেরে এক রাতেই হাজার হাজার মানুষকে শরণার্থী করে দিচ্ছি! নিজের বিবেককে কখনো প্রশ্ন করেছেন কি?

কেন এই ধর্ম? ধর্ম আসলে কী? কেন আমরা এতগুলো ধর্মে ভাগ হয়ে গেলাম? পুরোহিত – ভান্তে – যাজক – মোল্লা এদের জিজ্ঞেস করুন। কেউ উত্তর দেবে না কারণ ধর্ম এদের কাছে পাপ-পুণ্য নয়, ব্যবসা। সবাই আপনাকে স্বর্গে পাঠাতে ব্যস্ত তবে মৃত্যুর আগে নয়, পরে! তার মানে বাকির ব্যবসা। মারা গেলেই বলে স্বর্গীয় ’তমুক’ কিংবা ’অমুককে’ যেন বেহেশত নসীব করেন! নরকে কেউ যেতে চায় না সবাই চায় স্বর্গে যেতে! কিন্তু কারো একরত্তি সময় নেই নিজেকে চেনার কিংবা আত্মদর্শনের সাধনায় নিমগ্ন হবার। জন্মের সময় না হয় আপনার অজান্তে আপনাকে ধর্মান্তরিত করা হল কিন্তু এখন তো আপনি আর শিশুটি নন। নিজেকে বিজ্ঞানী, দার্শনিক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, নভোচারী, রাষ্ট্রপতি, সমাজপতি, চাকুরীজীবি, ব্যবসায়ী, লেখক, কবি, পুরোহিত, ভান্তে, যাজক, মোল্লা, ভন্ড, খুনি, মাতাল, লম্পট, বেশ্যা ইত্যাদি বানালেন কিন্তু একবারও খবর নিলেন না আসলে আমার ধর্মটা কী? আমি তো শিশু ছিলাম, তারপর কিশোর-যুবা-প্রৌঢ়-বৃদ্ধ। কীভাবে আমি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম বা অন্য কোন ধর্মের লোক হলাম? আমি বারবার বলছি আপনাকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে তার মানে আপনার একটি ধর্ম জন্মের পূর্ব থেকেই ছিল? কী সেই ধর্ম? [চলবে]

Advertisements

তুমি আমি

আমি জানি আমি কে
আমি জানি না আমি কে
তুমি আমি আর আমি তুমি।

আমি ফুল তুমি মৌ
আমি নদী তুমি নৌ
আমি রাত তুমি তারা
আমি নেই তুমি ছাড়া

মন বলে তুমি রঙ
প্রেম বলে তুমি সঙ
এই নেই এই আছো
অগোচরে ভালোবাসো

আমি জানি আমি কায়া
জানি নাই তুমি মায়া
আমি জানি আমি পাপ
তবু কেন করো ভাব

সায়রের মাঝখানে
দিশেহারা পাখি সব
আসমানে বসে তুমি
চুপি চুপি শুনি আমি
আমারই মাঝে তুমি
করো কলরব

কে তুমি কে আমি
কে স্বামী কে যামী
কে শশী কে দোষী
কে শমী কে রোষি …

আমি জানি আমি কে
আমি জানি না আমি কে
তুমি আমি আর আমি তুমি।

সালাত (নামায) জাহান্নামেরও চাবি – শেষ পর্ব

”এবং সালাত কায়েম কর এবং যাকাত দাও এবং রসূলের অনুসরণ কর যাতে তোমরা রহমত পেতে পার” (সূরা নূর, আয়াত: ৫৬)।

ইসলামের অনুসারীরা বর্তমানে সালাত তথা নামায এবং জান্নাত বিষয়ে এতই উৎসাহী হয়ে গেছে যে তারা বুঝতেই চেষ্টা করে না যে কেন তারা নামায পড়ছে এবং স্বাদের লাউ তথা জান্নাত আসলে কী। মসজিদের ইমাম হতে শুরু করে তথাকথিত আলেম-ওলামা এবং পীর ছাহেবরা, তাবলীগ-জাকির নায়েক-বিলাল ফিলিপসরা, নব্য যুক্ত হওয়া মিডিয়ার ’ইসলামী অনুষ্ঠান’ ওয়ালারা, এমনকি আমাদের দেশে যানবাহনের পেছনের অংশ সবাই শুধু একটি কথাই প্রচার করছে- নামায পড়রে জান্নাত চলরে! ’সালাত (নামায) জাহান্নামেরও চাবি’ ধারাবাহিকটির ছয়টি পর্বে আমি সংক্ষেপে বুঝাতে চেষ্টা করেছি সালাত আসলে কী, জান্নাত আসলে কী। যারা বুঝবে তাদের জন্য অল্প ইশারাই যথেষ্ট আর যারা বুঝবে না তাদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে জ্ঞানের শুভ বোধোদয় কামনা করছি।

উপরোক্ত আয়াতটিতে বলা হচ্ছে সালাত কায়েম করতে, যাকাত আদায় করতে এবং রসূলের অনুসরণ করতে। করলে আমাদের লাভ? আমরা মহান আল্লাহর রহমত পাবো। আয়াতটি থেকে চারটি বিষয় পেলাম- সালাত, যাকাত, রসূল ও রহমত। সালাত সম্পর্কে বিগত ছয়টি পর্বে বলে এসেছি। বাকি তিনটি বিষয়ে আমি আলোচনা করব সালাতের আলোকে।
প্রথমে আসি যাকাত বিষয়ে। যাকাত কী? আমরা জানি পুরো বছরের উদ্ধৃত সম্পত্তির শতকরা আড়াই ভাগ যারা যাকাত পাবার হকদার তাদের মাঝে বন্টন করে দেয়া। ভাল কথা। বলা হয় যাকাত নাকি যার সম্পদ আছে অর্থাৎ ধনীরাই দেবে যেভাবে হজ্ব নাকি শুধু ধনীদের জন্য! তবে কি ইসলামের কিছু ইবাদত শুধু ধনীদের জন্য? সেখানে গরীবের কোন প্রবেশাধিকার নেই? যাকাত কিংবা হজ্ব নামক ইবাদত থেকে গরীবরা কি তবে বাদ পড়ে যাবে? মোটেই না। আমাদের জ্ঞানহীন কর্মকা-ের দ্বারা আমরাই ইসলামকে ধনী-গরীবে ভাগাভাগি করে ফেলেছি। ভারসাম্যের জন্য পৃথিবীতে ধনী-গরীব থাকতে পারে যেভাবে ভাল-মন্দ আছে। ধনীর ধনে গরীবের হক আছে এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। গরীব আছে বলেই ধনীর এত সৌন্দর্য, এত বাহাদুরী। কিন্তু ইসলামে কোন ধনী-গরীব নেই। এখানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমী কুলি হতে শুরু করে উচু তলার সাহেব সবার জন্য ইবাদত সমান। কুলি বা রিকশাওয়ালা সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সেজন্য তার দু’ওয়াক্ত নামায পড়লে হয়ে যাবে এরকম কোন বিধান ইসলামে নেই। আয়াতটিতে ’যাকাত দাও’ বলতে কি শুধু ধনীদেরকে যাকাত দিতে বলা হয়েছে না সবার জন্যই যাকাত? ’সালাত কায়েম কর এবং যাকাত দাও’ এরকম কথা কোরআনে অনেক স্থানে বলা হয়েছে। কোথাও তো একবারের জন্যও বলা হয়নি যে ’সালাত কায়েম কর এবং যাকাত দাও ধনীরা’। আসলে আমরা ’যাকাত’ বলতে কী বুঝানো হয়েছে কিংবা যাকাত কে দেবে সেটিই জানি না। আমি আমার আগের অনেক লেখায় বলেছি যে সালাত, যাকাত, রোযা, হজ্ব এগুলো শুধুমাত্র ঈমানদারদের জন্য, ইসলামের অনুসারী কিংবা মানুষদের জন্য নয়। ঈমানদার ধনী কি গরীব সেটা বিবেচ্য নয়, ঈমানের অধিকারী হলেই তাঁকে সালাত, যাকাত, রোযা, হজ্ব এগুলো অবশ্যই করতে হবে। এখন একজন ’গরীব’ ঈমানদার যাকাত কীভাবে দেবে যার নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা! আমি ’গরীব’ শব্দটিকে গুরুত্ব দিয়েছি কারণ ধনী-গরীব এগুলো ঈমানদারের বিশেষণ নয়। ঈমান তথা ঐশী শক্তিই একজন ঈমানদারের মূলধন এবং এ ঈমানের বলে একজন ঈমানদার কী কী করতে পারেন তার ফিরিস্তি দিতে গেলে এ লেখা আর শেষ করা যাবে না। ঈমানদারের যাকাত হল সে তার অন্তর থেকে যাবতীয় বস্তুমোহ এবং মানবীয় আমিত্ব উৎসর্গ তথা যাকাত করে দিয়ে মনের মধ্যে মহাশূন্যভাব জাগিয়ে তোলা। ষড়রিপু (ছয় রিপু যথা: কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য্য) থেকে মনকে পবিত্র করার নামই যাকাত। উদ্ধৃত সম্পত্তি থেকে শতকরা আড়াই ভাগ দেয়ার যাকাত খুবই সোজা কিন্তু মন থেকে ষড়রিপু দূর করার যাকাত খুবই কঠিন। বুঝা যাচ্ছে সালাত যার কায়েম হয়ে যাবে তার জন্য যাকাত তখন আর কোন কষ্টের হবে না। মহান আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হতে গেলে যাকাত দিতেই হবে, আর যাকাত দেয়া হয়ে গেলে জান্নাত তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাবে। নইলে জাহান্নাম অবধারিত।
এবার আসি রসূল প্রসঙ্গে। এ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে মহান আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হয়ে আমার বিনীত প্রার্থনা আমি যেন সর্বপ্রকার ভুল থেকে মুক্ত থাকতে পারি কারণ মহান আল্লাহর পরেই নবী-রসূলের স্থান এবং নবী-রসূলের মাধ্যমেই আমি (’আমরা’ বলিনি) মহান আল্লাহ ও ইসলামের পরিচয় পেয়েছি। প্রথমেই বলে রাখি নবী-রসূলের কোন মৃত্যু নেই। কোরআনে কোথাও বলা হয়নি নবী-রসূলদের মৃত্যু হয়েছে। মুহাম্মদের মৃত্যু হতে পারে কিন্তু নবীর মৃত্যু নেই। রসূলরা এসেছিলেন, আসছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত আসবেন। কিন্তু নবী আর আসবেন না। কোরআনে কোথাও ’খাতামার রসূল’ তথা ’শেষ রসূল’ বলা হয়নি, বলা হয়েছে ’খাতামান নবী’ তথা ’শেষ নবী’। এখন আমাকে বুঝতে হবে ’রসূল’ শব্দের অর্থ কী। ’রসূল’ অর্থ প্রতিনিধি। প্রতিনিধি অর্থ যিনি কারোও প্রতিনিধিত্ব করেন। কোরআন মতে রসূলরা মহান আল্লাহর প্রতিনিধি অথবা কোনও নবীর মনোনীত প্রতিনিধি। ’নবীর প্রতিনিধি’! অবাক হচ্ছেন? হাদীসে আছে, ”নিশ্চয়ই জ্ঞানীগণ নবীর নায়েব তথা উত্তরাধিকারী তথা প্রতিনিধি”। খেয়াল করুন, আমি বলেছি ’জ্ঞানীগণ’, তথাকথিত মাদ্রাসা কিংবা আরবী পাস ’আলেমগণ’ নন। প্রত্যেক নবী একজন রসূল কিন্তু প্রত্যেক রসূল নবী নন। মানুষরা পৃথিবীতে মহান আল্লাহর পরিচয় পেয়েছিল নবীদের মাধ্যমে আর এখন পাচ্ছেন কিংবা পাবেন রসূলদের মাধ্যমে। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, রসূলের পরিচয় যারা পায়নি তাদের সাথে চতুষ্পাদ প্রাণীর কোন পার্থক্য নেই। কারণ মহান আল্লাহ চতুষ্পাদ প্রাণীদের জন্য রসূল পাঠাননি, পাঠিয়েছেন মানুষদের জন্য আর সেই মানুষরা যদি রসূল না চিনে তবে এর চেয়ে দুঃখজনক পৃথিবীতে আর কিছু নেই। প্রশ্ন হল ’রসূল’ কারা? রসূল তাঁরাই যাঁরা আপনাকে মহান আল্লাহর বাস্তব পরিচয় দিতে পারেন এবং আল্লাহর রাস্তা তথা পথ চিনিয়ে দিতে পারেন। আমি আগেই বলেছি নবী-রসূলের কোন মৃত্যু নেই। কীভাবে? আয়াতটি পড়ুন,
”এবং মনে করিও না তারা মৃত, যারা আল্লাহর পথে কতল হয়। বরং তারা জীবিত রবের নিকট, রেজেকপ্রাপ্ত” (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৬৯)।
বলা হচ্ছে, আল্লাহর পথে যাঁরা মারা যায় তাঁরা জীবিত, শুধু জীবিত নয় তাঁরা সেখানে রিজিকও পায়। গালগল্প মনে হচ্ছে? মাটির তৈরী একটি ইটকে আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি করার পর সেটা হাজার বছর মাটিতে পুঁতে রাখলেও মাটির সাথে যেভাবে মিশে যায় না ঠিক মানুষও তাই তবে তাকে মহান আল্লাহর নূরে আলোকিত হতে হবে। কথা হল ’আল্লাহর পথে’ যে মারা যাবে ’আল্লাহর পথ’ কোনটি? কে চেনাবে আল্লাহর পথ? কারণ পথ যে আরেকটি আছে আর তা হল শয়তানের পথ। আল্লাহর পথের পরিচয় দিতে পারেন একমাত্র রসূলরা। রসূলদের নিকট থেকে আল্লাহর পথের পরিচয় পেয়ে সে পথে অটল থেকে মারা গেলে কোরআন মতে যদি কাউকে মৃত বলা না যায় তবে রসূলদের ক্ষেত্রে কী বলবেন? বর্তমানে রসূল কারা সেটা জানতে হলে আরেকটু ধৈর্য্য ধরতে হবে আমার আরেকটা লেখার জন্য যার বিষয়বস্তু হবে রসূল। সোজা কথা হল, রসূলের পরিচয় যারা পাবে না তাদের দ্বারা সালাতও হবে না আর তারা জান্নাতও চিনবে না। বাংলা বর্ণমালা কোন শতাব্দীতে কে আবিষ্কার করে বাংলা ব্যাকরণ বানিয়েছেন আমরা জানলেও বর্তমানে বাংলা বর্ণমালা জানতে কিংবা বুঝতে একটি শিশুকে বই ধরিয়ে দিলেই কি সে আপনা-আপনি শিখে ফেলবে না তার জন্য শিক্ষকের প্রয়োজন হবে? আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছতে হলে আগে আপনাকে আল্লাহর পথের পরিচয় পেতে হবে যা দিতে পারেন একমাত্র রসূলগণ। কোরআন-হাদীস-ইজমা-কিয়াস পড়ে প-িত হওয়া যায় কিন্তু আল্লাহর পথের পরিচয় পাওয়া যায় না। যায় না বলেই শত শত পথ ও মতের সৃষ্টি এক ইসলাম নিয়ে।
শেষ বিষয় হল রহমত। যেহেতু আয়াতটিতে বলা হয়েছে ’রহমত পেতে পার’ বুঝা যাচ্ছে ’রহমত’ কোন অলৌকিক বিষয় নয়। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে আমরা আল্লাহর রহমত স্বরূপ পাচ্ছি বিভিন্ন কিছু যেমন-বৃষ্টি, পানি, খাদ্য, বায়ু ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। এগুলো ’সাধারণ রহমত’ যা একটা শূকর কুকুর হতে শুরু করে ধর্মী-বিধর্মী আমি আপনি সবাই পাচ্ছি সালাত-যাকাত না করা সত্ত্বেও। তবে ’বিশেষ রহমত’ কোনটি? উত্তরটি পেতে হলে আপনাকে অনুরোধ করছি আবার একটু পড়ার জন্য ’বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ অর্থাৎ ’আল্লাহর আর রহমান আর রহিম নামের সাথে’। ’রহমান’ রূপে তিনি সবাইকে (নাস্তিকদেরও) রহমত করে যাচ্ছেন কিন্তু ’রহিম’ রূপে তিনি সবার জন্য নন। মহান আল্লাহকে ’রহিম’ রূপে পাবে শুধু তাঁরাই যাঁদের সালাত কায়েম হয়ে গেছে, যাকাত আদায় হয়ে গেছে এবং যাঁরা রসূলের পরিচয় পেয়েছে। ’রহিম’ রূপে পূর্বে তিনি দশজনকে সহ আরো অনেককে পৃথিবীতে থাকতে জান্নাত দিয়ে ফেলেছেন, সেখানে আমি-আপনি জান্নাত জান্নাত করে মাথা ফাটিয়ে কোন লাভ নেই। ’রহিম’ রূপে রহমত পেলে আপনিও জান্নাত পেয়ে যাবেন, পৃথিবীতেই।

৬ষ্ঠ পর্বঃ https://armanarju.wordpress.com/2016/11/19/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A4-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%AF-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0-6/

সালাত (নামায) জাহান্নামেরও চাবি – ৬ষ্ঠ পর্ব

”সালাত কায়েম করো সূর্য হেলে পড়া, রাতের আঁধারে আচ্ছাদিত হওয়ার কারণে এবং ফযরের কোরআন-এর জন্য। নিশ্চয়ই ফযরের কোরআন হলো প্রমাণিত” (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৭৮)।
ধারাবাহিকটির ৫ম পর্বে আমি উপরোক্ত আয়াতটির ব্যাখ্যায় সূর্য বলতে জীবন এবং রাতের আঁধার বলতে মৃত্যুকে বুঝিয়েছিলাম। এ পর্বে চেষ্টা করব আরেকটু উচ্চতর ব্যাখ্যা দেয়ার।
আমাদের জীবনের প্রারম্ভিক পর্বে আমরা সবাই ছিলাম অজ্ঞানতার অন্ধকারে। একটা শিশু মায়ের গর্ভ থেকে শিক্ষিত হয়ে আসে না, তাকে জীবনের ধাপে ধাপে শিক্ষা অর্জন করতে হয়। এবং এ শিক্ষাটা সে নিজে নিজে অর্জন করতে পারে না, কারো না কারো দ্বারস্থ তাকে হতে হয়। এভাবে যখন সে শিক্ষিত হয় তখন তার মধ্যে আর পরমুখাপেক্ষিতা থাকে না। বরঞ্চ সে আরো অনেককে শিক্ষা দিতে পারে। যদি সে শিক্ষিত না হয় তবে তাকে সারাজীবন থাকতে হয় পরনির্ভর।
আয়াতটিতে সূর্যকে যদি আমরা জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করি তবে রাতের আঁধার হবে অজ্ঞানতার অন্ধকার। আমার জ্ঞান সূর্যটি যেন হেলে পড়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারে পর্যবসিত না হয় সেজন্য বলা হচ্ছে সালাত কায়েম করতে। একজন শিক্ষক ব্যতীত যেমন জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে না ঠিক তেমনি সালাত কায়েম ছাড়া জ্ঞান সূর্যের বিকাশও হবে না। আর জ্ঞান সূর্যের বিকাশ না হলে আপনি অজ্ঞানতার সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকবেন বড় বড় ’ডিগ্রী’ (সনদ) থাকা সত্ত্বেও। এ রকম অনেক অজ্ঞানদের আমরা এখন পৃথিবীতে দেখছি ধর্মের আলখেল্লা পরে বিরাট বিরাট বইয়ের জ্ঞান অর্জন করে নতুন নতুন বিধান জারী করতে। এরা শুধু আরবী বর্ণমালা ’আলিফ’, ’বে’, ’তে’, ’ছে’ কে ’আলিফ’, ’বা’, ’তা’, ’ছা’-ই শুধু পড়তে শিখেছে আর কিছুই শিখেনি তাদের অন্ধ উস্তাদদের (শিক্ষক) শেখানো তোতা পাখির মত কিছু বুলি ব্যতীত। এক হাদীসে আছে ”জ্ঞান অর্জন ফরয তথা আবশ্যক”। আবার আরেক হাদীসে আছে, ”সত্য অর্জনের পথে জ্ঞান হল সবচেয়ে বড় দেয়াল বা প্রতিবন্ধক”। বুঝা যাচ্ছে জ্ঞানেরও প্রকারভেদ আছে এবং আমাকে অর্জন করতে হবে সেই জ্ঞান যে জ্ঞান আমাকে সত্য তথা আল্লাহ এবং তাঁর রসূল এবং নিজের পরিচয় দান করবে।
সালাত কায়েম তথা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জ্ঞান সূর্যকে হেলে যেতে না দিয়ে অর্থাৎ জ্ঞানের উন্মেষকে পতনোন্মুখ হতে না দিয়ে ক্রমশ উন্নত করে রাখলে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর হয়ে ফযরের কোরআন তথা জ্ঞানের প্রভাত প্রাপ্তি হয়। কোরআন নিজেই জ্ঞানের আকর বা সুপ্রভাত। আর কোরআনের উৎস হলেন মহান আল্লাহ। সুতরাং কোরআনের জ্ঞান অর্জন অর্থ হল মহান আল্লাহর পরিচয় লাভ। গিরিশ চন্দ্র সেন বাংলা ভাষায় প্রথম কোরআনের তাফসীর করলেও মহান আল্লাহর পরিচয় লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদি তিনি সত্যিকার অর্থেই কোরআনের জ্ঞান অর্জন করতেন তবে তিনি মহান আল্লাহর পরিচয়ও লাভ করতেন এবং তখন তিনি তাঁর সনাতনী পৈতাটি আর রাখতে পারতেন না। সুতরাং গিরিশ চন্দ্র সেন জ্ঞান অর্জন করেছেন বটে তবে সেটি কোন জ্ঞান বুঝে নিন। এবার নিজেকে প্রশ্ন করুন তো কোরআন পড়ে পড়ে ইয়া বড় বড় তাফসীর বানালেন, ওয়াজ কিংবা লেকচার দিয়ে দিয়ে অনেক অনৈসলামিককে ইসলামে না ঢুকিয়ে নিজের দলে ঢুকিয়ে মুরিদের/ভক্তের পাল্লা ভারী করলেন, নিজের পকেট ঠিক রাখার জন্য মানুষদের বোকা বানিয়ে ধর্মকে বেঁচে প্রতিষ্ঠা করলেন ’ইসলামি এনজিও’ কিংবা ’ইসলামি দল’, তাবলীগ নাম দিয়ে ’ছোওয়াব’ আর ’ফায়দার’ টোপ বসিয়ে মানুষদের জান্নাতে ঢুকিয়ে (!) নিজের আখের গোছালেন, ’জিহাদের’ জোশ তুলে সরল মানুষদের জংলী বানালেন, আসলেই কি মহান আল্লাহর পরিচয় লাভ করেছেন? কায়েম তথা প্রতিষ্ঠা দূরে থাক এরা জানেই না ’সালাত’ আসলে কী। সুতরাং সালাত যার কায়েম হবে না কোরআনের জ্ঞান প্রাপ্তিও তার হবে না এবং সে মহান আল্লাহর পরিচয়ও পাবে না। তবে সে কীভাবে জান্নাতের আশা করে?

৫ম পর্বঃ https://armanarju.wordpress.com/2016/11/04/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A4-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%AF-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0-5/

সালাত (নামায) জাহান্নামেরও চাবি – ৫ম পর্ব

”সালাত কায়েম করো সূর্য হেলে পড়া, রাতের আঁধারে আচ্ছাদিত হওয়ার কারণে এবং ফযরের কোরআন-এর জন্য। নিশ্চয়ই ফযরের কোরআন হলো প্রমাণিত” (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৭৮)।
উপরোক্ত আয়াতটির চমকপ্রদ যেসব অনুবাদ ও ব্যাখ্যা আমাদের মস্ত মস্ত পন্ডিত তাফসীরকারকরা দিয়েছেন সেসব পড়লে আপনাকে ভিরমি খেতে হবে এবং ছিটকে পড়তে হবে আসল বিষয় থেকে। কয়েকটি উদারহরণ না দিলে আপনারা বুঝবেন না। একজন লিখেছেন (সঙ্গত কারণে নামগুলো বলছি না কারণ ব্যক্তিকে আক্রমণ আমার উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য জ্ঞানের দৈন্যটি দেখিয়ে দেয়া এবং মানুষদের সত্য ও সঠিক বিষয়টি জানিয়ে দেয়া),
”সূর্য হেলে পড়ার পর হতে রাতের ঘন অন্ধকার পর্যন্ত সালাত কায়েম কর এবং কায়েম কর ফজরের সালাত। ফজরের সালাত পরিলক্ষিত হয় বিশেষভাবে।” (কোথায় ’ফজরের সালাত’ আর কোথায় ’ফজরের কোরান’!)
আরেকজন লিখেছেন, ”সালাত কায়েম করো সূর্যের হেলে পড়া থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত, আর ফজরের কোরান পাঠ। নিঃসন্দেহ ফজরের কোরান পাঠ পরিলক্ষিত হয়”। (’কোরান পাঠ’-এর কোন কথা আয়াতটিতে নেই)
অন্য আরেকজন লিখেছেন, “Perform As-Salat (Iqamat-as-Salat) from mid-day till the darkness of the night (i.e. the Zuhr, ‘Asr, Maghrib, and ‘Isha’ prayers), and recite the Quran in the early dawn (i.e. the morning prayer). Verily, the recitation of the Quran in the early dawn is ever witnessed (attended by the angels in charge of mankind of the day and the night)” (অনুবাদক এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আবিষ্কার করে ফেলেছেন!)।
এবার আসুন আমরা জানতে চেষ্টা করি কেন মহান আল্লাহ সালাত তথা নামায কায়েম করতে বললেন সূর্যের হেলে পড়ার কারণে, রাতের আঁধারে আচ্ছাদিত হওয়ার কারণে এবং ফযর তথা ভোরের কোরআন এর জন্য। আমি আমার আগের অনেক লেখাতে বলেছি কোরআনে যেখানেই মহান আল্লাহ কোন রহস্যের কথা উল্লেখ করেছেন সেখানেই রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন আর এ রহস্যের ভেদ তাঁদের পক্ষেই উদঘাটন করা সম্ভব যাঁরা নিজেদের পবিত্র করতে পেরেছে। সেজন্যই মহান আল্লাহ কোরআনে বলছেন,
”পবিত্রগণ ব্যতীত ইহা (কোরআন) কেউই স্পর্শ করে না” (সূরা ওয়াকেয়া, আয়াত: ৭৯)।
যারা নিজেদের ভেতরকে পবিত্র করতে পারেনি তাদের পক্ষে কোরআন বুঝা অথবা স্পর্শ করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। মার্কা মারা তাফসীর আর অনুবাদের করুন দশা এ কারণেই। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন কেন আল্লাহ রহস্যের মধ্যে রূপকের আশ্রয় নিলেন। আমিও প্রশ্ন করব রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা শেক্সপিয়র এঁদের কবিতা কি সবাই বুঝতে পারে? তাঁরাও তো তাঁদের পদ্যে রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন। কেন? বিখ্যাতদের লেখা বুঝতে হলে আপনাকে বোধগম্যতার একটা পর্যায়ে অবশ্যই পৌঁছতে হবে যা অধ্যবসায় আর সাধনা ব্যতীত অসম্ভব। ঠিক কোরআন অনুধাবন করতে হলেও আধ্যাত্মিকতার একটা অবস্থানে অবশ্যই আপনাকে যেতে হবে যা একজন কামেল মুর্শিদ তথা আল্লাহওয়ালা ব্যতীত সম্ভব নয়। অধ্যাত্ম জ্ঞান ছাড়া কোরআন নিয়ে কিছু বলতে যাওয়ার অর্থ হল সাঁতার না জেনে সাগরে অবগাহনের চেষ্টা করা।
আয়াতটিতে সূর্যটি হল আমাদের জীবন তথা আয়ু। জীবন কিন্তু থেমে নেই। সূর্য যেমন উদয় হয়ে ধীরে ধীরে পূর্ণতায় এসে আবার ঢলে যেতে থাকে ঠিক মানবজীবনটারও ঐ একই দশা। শিশুকাল শেষে যৌবনে এসে আবার বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হওয়া এবং এক সময় মৃত্যুর অন্ধকূপে পতিত হয় যাকে কোরআন উপমায় বলছে রাতের আঁধার। কোরআনে মানব ব্যতীত অন্য কোন সৃষ্টিকে সালাত কায়েম করতে বলা হয়নি যদিও বা তাদেরও বাল্য, যৌবন ও পরিণতি আছে। অন্য কোন সৃষ্টিকে কেন সালাত কায়েম করতে বলা হয়নি? কারণ তাদের কাউকেও কোরআন দেয়া হয়নি।
”নিশ্চয় আমরা তোমার উপর কোরআন নাযেল করেছি” (সূরা ইনসান, আয়াত: ২৩)।
একমাত্র মানবকেই কোরআন দেয়া হয়েছে। আর তাই সেই মানবকেই বলা হচ্ছে সালাত কায়েম করতে ফযর তথা ভোরের কোরআনের পরিচিতি লাভ করার জন্য। সালাত কায়েম হয়ে গেলেই নিজের প্রথম পরিচয় তথা কোরআনের রহস্যই প্রথমে লাভ হয়। এবং এ রহস্য যার অবগত হয়েছে সেটা তার কাছে স্পষ্টরূপে প্রমাণিত কারণ তখন সে বুঝতে পারে কোরআন আসলে কী। আর তাই বলা হয়েছে ’ফযরের কোরআন হলো প্রমাণিত’। নিজের ভেতর যখন যৌবন প্রকাশিত হয় সেটা বাইরের কেউ না বুঝলেও নিজে কিন্তু ঠিকই বুঝি এবং নিজের যৌবন নিজের কাছে স্পষ্টরূপে প্রমাণিত (উদাহরণ দিলাম না, দয়া করে বুঝে নেবেন)। ঠিক কোরআন যার ভেতর উদ্ভাসিত হয়েছে একমাত্র সে-ই বুঝে যে কোরআন একটি নূর এবং এর ওজনও আছে। আরো অনেক রহস্য আছে কিন্তু বলা যাবে না। তাই জীবনসূর্য রাতের আঁধারে ঢেকে যাবার আগে সালাত কায়েম করুন এবং পরিচয় লাভ করুন কোরআনের আর মুক্তি লাভ করুন জাহান্নাম থেকে।

৪র্থ পর্বঃ https://armanarju.wordpress.com/2016/10/28/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A4-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%AF-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0-4/

সালাত (নামায) জাহান্নামেরও চাবি – ৪র্থ পর্ব

”নিশ্চয় সালাত যৌন অশ্লীলতা ও অবিশ্বাস নিবারণ করে” (সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)।
অত্যন্ত সহজ ভাষায় মহান আল্লাহ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন সালাত কোন কোন কার্য থেকে বিরত রাখবে। আয়াতটি শুরু হয়েছে ’নিশ্চয়’ দিয়ে অর্থাৎ আল্লাহ এখানে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন যে সালাত অবশ্যই যৌন অশ্লীলতা ও অবিশ্বাস নিবারণ করে। সোজা কথায় সালাত কায়েম হয়ে গেলে যৌন অশ্লীলতা ও অবিশ্বাস আর থাকবে না। আর কায়েম না হলে থাকবে। কিন্তু পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীতে আমরা কোন চিত্রটি দেখছি। দেখা যাচ্ছে যিনি নামায পড়ছেন সেই তিনি আবার যাবতীয় অশ্লীল কাজে মেতে উঠছেন, যেমন- সম্মানী ব্যক্তি (!) বলে প্রকাশ্যে কোন নারীর শরীরে হাত দিতে না পারলেও মনে মনে সেই নারীর সাথে বিছানায় পর্যন্ত চলে যান। মানুষ বাহির থেকে দেখে লোকটি খুব সম্মানী কিন্তু তার ভেতর যে অশ্লীলতায় ভরপুর তা মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ তো দেখছে না। দেখা যাচ্ছে আপনি মানুষকে ভয় পাচ্ছেন আল্লাহকে নয়। মসজিদে কিংবা জায়নামাযে যাদের দেখছেন তারা কিন্তু প্রকাশ্যে যৌন অশ্লীলতা করে বেড়ায় না। করে গোপনে। মহান আল্লাহ হাত দিয়েছেন সেখানে। প্রকাশ্য কিংবা গোপন সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করতে হবে। আমাদের সমাজে দেখা যায় কোন মানুষ মারা গেলে জানাযার পর কেউ একজন বলে উঠে, ’লোকটি কেমন ছিল’। শোকে-দুঃখে কাতর আমরাও বলে উঠি, ’খুব ভাল ছিল’। ’ভাল ছিল’ এটা তো লোকটির বাহিরের রূপ, ভেতরে সে কেমন ছিল আপনি কি জানেন? অথচ আপনি সাক্ষ্য দিলেন ’ভাল ছিল’! লোকটি যদি ভাল হয় তো বেঁচে গেলেন কিন্তু যদি উল্টোটি হয় তবে তো আপনি মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার অপরাধে অপরাধী। নিজেরই ঠিক নেই আরো দিচ্ছি মিথ্যা সাক্ষ্য! অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া কিছু ’আলেম’ আমাদের শিখিয়েছেন, কোন মৃত ব্যক্তিকে চল্লিশজন ’ভাল’ বললে মহান আল্লাহও নাকি তাকে ভাল বলবেন! দেখা যাবে কেয়ামতের ময়দানে ভালোদের কী পরিণতি হয়।
আবার দেখা যাচ্ছে যিনি নামায পড়ছেন সেই তিনি আবার যাবতীয় অবিশ্বাসে মেতে উঠছেন। সুদ-ঘুষ হারাম এটা আমরা বিশ্বাস করি কিন্তু দেখা যায় যিনি নামায পড়েন তিনি আবার সুদ-ঘুষে মেতে উঠেন! অনর্থক কথা এবং কাজ ইসলাম সমর্থন করে না। কিন্তু আমরা নামায পড়ি আবার ক্রিকেট-ফুটবলের মত অনর্থক কাজে মেতে থাকি! পরের জায়গা, পরের টাকা, পরের স্ত্রী ইত্যাদির দিকে চোখ দিতে ইসলাম অনুমোদন দেয় না। আমরা নামায পড়ি আবার চিন্তা করি কীভাবে অসহায়ের জায়গা নিজের আয়ত্তে নিয়ে আনা যায়। এভাবে হিসেব করলে দেখা যাবে আমরা নামায পড়ি ঠিকই কিন্তু সাথে সাথে অবিশ্বাসের কাজেও মেতে উঠি। তো আপনিই বলুন এ নামায কীভাবে আপনাকে জান্নাতে নেবে?
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানা-নামাযীওয়ালা-দাড়িওয়ালা-পাগড়ীওয়ালা-টুপিওয়ালা-ওয়াজ-লেকচার সবগুলোই ক্রমাগত বাড়ছে সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিত্যনতুন পাপকার্যও! কেন? কারণ যিনি নামায পড়াচ্ছেন তিনিও জানেন না কেন পড়াচ্ছেন আর যিনি পড়ছেন তিনিও জানেন না কেন পড়ছেন। খাবার খেলে জিহ্বা মজা পায়, পেট ভরে, দেহ শান্তিতে থাকে। পেট যে খাবার বুঝে পেয়েছে এটা আমরা টের পাই যখন ভেতর থেকে একটা শব্দ আসে যাকে ’ঢেক’ বলা হয়। ঠিক নামায কায়েম করতে পারলে ক্বলব মজা পায়, সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গুলো (লতিফা) নূরের পরশ পেয়ে ভরে উঠে, দেহ পবিত্র থাকে। সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গুলো (লতিফা) যখন নূরের পরশ পায় তখনও ভেতর থেকে একটা শব্দ আসে। আর বলা যাবে না। নিজেকে প্রশ্ন করুন নামায পড়বেন না কায়েম করবেন।

৩য় পর্বঃ https://armanarju.wordpress.com/2016/10/07/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A4-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%AF-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0-3/

সালাত (নামায) জাহান্নামেরও চাবি – ৩য় পর্ব

”ওহে ঈমানদারেরা, তোমরা সালাতের (নামাযের) নিকটবর্তী হও না এবং তোমরা নেশাগ্রস্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না বুঝ তোমরা কী বলছ” (সূরা নেসা, আয়াত: ৪৩)।
আমাদের অনেক মাথামোটা তাফসীরকারক আয়াতটির ব্যাখ্যায় লিখেছেন, মদের নেশায় মাতাল হয়ে যারা নামায পড়তে যেতেন তাদের জন্য নাকি আয়াতটি এসেছে! হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। এসব তাফসীরগুলোকে বাঙালির হাসির গল্প বললে কম বলা হবে। আমার বিশ্বাস বর্তমানে যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে যেয়ে আদায় করেন তারা আশা করি মদ্য পান করেন না। যারা মদ্য পান করেন তারা নামায পড়েন বলে মনে হয় না। তবে কি আয়াতটির কার্যকারিতা শেষ? মোটেই না। আয়াতটির গভীরে যাওয়ার আগে আরেকটি প্রসঙ্গে আসি। কোন সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে আয়াতটি নাযিল করা হয়েছে তা আগে আমাকে দেখতে হবে। বলা হয়েছে, ’ওহে ঈমানদারেরা’ (আরবীতে ’ইয়া আইয়ুহাল্লাজীনা আ’মানু’), বলা হয়নি, ’ওহে মানুষেরা’ (আরবীতে ’ইয়া আইয়ুহাল ইনসানু’)। ঈমানদার এবং মানুষ কিন্তু এক জিনিস নয়। আবার সব মানুষেরা কিন্তু ইসলামের অনুসারী নয়। কোরআনে কোথাও ইনসান অর্থাৎ মানুষকে সালাতের (নামাযের) জন্য সৃজন করা হয়েছে বলা হয়নি, বলা হয়েছে শুধু ইবাদতের জন্য সৃজন করা হয়েছে। ইবাদত কী? সোজা কথায় মহান আল্লাহর স্মরণ। তো সালাতও তো এক প্রকার ইবাদত। মানুষকে দেয়া হয়েছে শুধু ইবাদতের নির্দেশ আর ঈমানদারকে সালাতের। কেন? দেড় মাসের বাচ্চাটি খেয়েছে বললে আমরা বুঝবো বাচ্চাটি মায়ের দুধ (অথবা বর্তমানে বোতলের দুধ যেহেতু মায়েরা অত্যধিক ব্যস্ত!) খেয়েছে আর আপনি খেয়েছেন বললে বুঝবো আপনি ভাত বা এ জাতীয় কিছু খেয়েছেন। উভয়ে খেয়েছে কিন্তু উভয়ের খাওয়া কি এক? মানুষও ইবাদত করবে ঈমানদারও ইবাদত করবে, ইবাদত ঠিক আছে কিন্তু উভয়ের ইবাদত এক নয়। বুঝা গেল সালাত কায়েম করতে হলে ইনসান অর্থাৎ মানুষ হতে পদোন্নতি পেয়ে ঈমানদার হতে হবে। নচেৎ সালাত করবেন বটে তবে এ সালাত আপনাকে আবারও নিয়ে যাবে পাপের বাজারে এবং অবশেষে জাহান্নামে।
এবার আয়াতটিতে আসি। ঈমানদারদেরকে মহান আল্লাহ বলছেন, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের নিকটেও যেও না। সালাত মানে কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামায নয় (সালাত জাহান্নামেরও চাবি – ২য় পর্ব দেখুন), সালাত একটি সার্বক্ষণিক বিষয়। নেশা কিন্তু অনেক প্রকার। মদ্যপান একটি নেশা। বর্তমানে অনেককে দেখা যাচ্ছে ক্রিকেট নামক একটি নেশায় বিভোর হয়ে থাকতে, এক্ষেত্রে দাড়ি-টুপি ওয়ালারাও কম যান না তারা আবার পাঁচ ওয়াক্ত নামায খুব যত্ন সহকারে পড়েন! মহিলারা মেতে আছেন আধুনিক বাহারি কাপড়ের নেশায়, আবার কেউ কেউ মেতে আছেন মহিলাদের নেশায়, কেউ টাকার নেশায়, কেউ বাড়ি, কেউ গাড়ি, কেউ নিত্যনতুন মোবাইল ফোন ইত্যাদি হরেক নেশায় আমরা বিভোর হয়ে আছি আল্লাহকে পাওয়ার নেশা ব্যতীত। কিন্তু একজন ঈমানদারের এসব নেশা থেকে থাকতে হবে অনেক দূরে কারণ সে ঈমানের অধিকারী। ঈমানের মূল্য কোন কিছুর বিনিময়ে দেয়া সম্ভব নয়। ঈমানের অধিকারী হওয়া মহান আল্লাহর দয়া ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং যাকে আল্লাহ দয়া করবেন তাকে চাইবেন জগতের সমস্ত প্রকার নোংরামি থেকে দূরে রাখতে নইলে ঈমান হারা হয়ে সে আবার শয়তানের পথে চলে যেতে পারে। তাই মানুষ হতে পদোন্নতি পেয়ে ঈমানদার হতে গেলে দুনিয়ার যাবতীয় নেশা অন্তর থেকে আপনাকে ফেলে দিতে হবে। পারলে জান্নাতী আর না পারলে জাহান্নামী।

২য় পর্বঃ https://armanarju.wordpress.com/2016/08/05/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A4-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%AF-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0-2/

আমি এবং জান্নাত ও জাহান্নাম

”নিশ্চয়ই আমরা ইনসানকে সৃষ্টি করেছি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সৌন্দর্য্যের মধ্যে। তারপর তাকে আমরা পরিণত করি নীচদের (অন্তর্গত) নীচরূপে। তাদেরকে ব্যতীত যারা ঈমানদার এবং আমলে সালেহা করে” (সূরা তীন, আয়াত: ৪-৬)।
”নিশ্চয় যারা ঈমানদার এবং আমলে সালেহা করে: এরা সবাই উত্তম জীব (সৃষ্টির মধ্যে)” (সূরা বাইয়েনা, আয়াত: ৭)।
পাঠক, উপরোক্ত চারটি আয়াত ভাল করে পড়ুন এবং মনে রাখুন। আরবী ’জান্নাত’ শব্দটি অনেকে বিশেষ করে নারীরা নিজেদের নাম হিসেবে রাখে কিন্তু কাউকে আপনি আরবী ’জাহান্নাম’ নামটি ভুলেও রাখতে দেখবেন না কারণ সবাই জাহান্নামকে ভয় পায় অপরদিকে পছন্দ করে জান্নাত এবং সবসময় কামনা করে জান্নাতে থাকতে যেন নানার বাড়ীর আবদার! আমাদের মধ্যে কেউ মৃত্যুবরণ করলে আমরা আগপাছ চিন্তা না করে তোতা পাখির মত শুধু আওড়াতে থাকি হে আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন, তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন! আরো মনে করি কোন মৃত ব্যক্তির জন্য চল্লিশজন জান্নাতের দোয়া করলে মহান আল্লাহ নাকি তাকে সসম্মানে জান্নাতে ঢুকিয়ে দেন! আরো মনে করি একটা কাফের (নিজে কাফের না অন্য কোন কীট তার কোন খবর নেই!) মারতে পারলে জান্নাতে যাওয়া আটকায় কে!
এবার আয়াত চারটিতে আসি। ইনসানকে অর্থাৎ মানুষকে মহান আল্লাহ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সৌন্দর্য্যের মধ্যে সৃষ্টি করলেও পরক্ষণে সেই মানুষকে আবার পরিণত করেন নীচদের (অন্তর্গত) নীচরূপে কিন্তু তাদেরকে নয় যারা ঈমানদার অর্থাৎ ঈমান নামক শক্তিটি যাদের আছে এবং যারা আমলে সালেহা অর্থাৎ সৎকর্ম করে। বলা হয় মানুষ নাকি ’আশরাফুল মাখলুকাত’ অর্থাৎ সৃষ্টির মধ্যে সেরা! কে বলেছে? সেরা হলে তাকে আবার নীচরূপে কেন থাকতে হবে? সেরা হলে সে কেন অধঃপতিত হবে? তাহলে সেরা কে? সেরা তারাই যারা ঈমানদার এবং আমলে সালেহা করে কারণ এরা সবাই উত্তম জীব (সৃষ্টির মধ্যে)। আমার কথা নয়, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই বলেছেন (সূরা বাইয়েনা, আয়াত: ৭)। সুতরাং আগে নিজেকে ভাল করে দেখুন ঈমানদার হতে পেরেছেন কিনা কিংবা রাশি রাশি ’ছোওয়াব’ হবে ভেবে যেসব কর্ম করছেন সেসব আসলে সৎ কিনা।
কোরআনে কোথাও জান্নাতকে উত্তম সৃষ্টি বলা হয়নি। বরঞ্চ বলা হয়েছে যারা সৃষ্টির মধ্যে সেরা অর্থাৎ ঈমানদার তাদের জন্যই শুধু জান্নাত। সুতরাং সৃষ্টির সেরা কেন তার চেয়ে নীচু একটা বিষয় নিয়ে (অর্থাৎ জান্নাত) এত মাতামাতি করবে? জান্নাত দিয়ে সে করবে টা কী? তার মর্যাদা তো জান্নাতের অনেক উপরে। বরঞ্চ জান্নাতের তাকে (অর্থাৎ ঈমানদারকে) দরকার নিজের দাম বাড়ানোর জন্য। জান্নাত তারাই খুঁজবে যাদের মর্যাদা জান্নাতের চেয়ে নীচে। জান্নাত তারাই খুঁজবে যাদেরকে মহান আল্লাহ ইনসান রূপেই সৃষ্টি করেছিলেন কিন্তু তার নিজের ব্যর্থতার দরুন সে চলে গেল জীব থেকে জন্তুর সারিতে। তাদের জন্য অনুতাপ ছাড়া অন্য কিছু নেই কারণ জাহান্নাম কিন্তু জন্তুদেরই খুঁজছে।
কোরআনে জান্নাত-জাহান্নাম বিষয়ে অনেক আয়াত আছে। কথা হল জান্নাত কিংবা জাহান্নাম আসলে কী? রাজকীয় মহল কিংবা বিভীষিকার কারাগার? আমি আর এগোতে পারছি না। রহস্যের জ্ঞান অর্জন সাধনার বিষয়। সাধনা করুন, আমলে সালেহা করুন, ঈমান অর্জন করুন তখন আপনিও জানতে পারবেন জান্নাত-জাহান্নামের রহস্য।

হাদীস বনাম জালিয়াতি

ফেসবুকে এক ভাই ’ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া’ নামক একটি ওয়েবসাইট থেকে ”বহুল প্রচলিত কিছু জাল হাদীছ”(!) নামক একটি লিংক নিজের ফেসবুক পাতায় শেয়ার করে আরো লিখেছেন ’জানার আছে অনেক কিছু!’ যাদের জ্ঞান কিংবা জানার সীমা মিডিয়া, অনলাইন আর বই পর্যন্ত তাদের জানার আরো অ-নে-ক কিছু থাকতে পারে বৈকি!
কথা হল হাদীস হাদীসই সেটা আবার জাল, দুর্বল (যঈফ) কিংবা মাওযূ হতে যাবে কেন? মহানবী (সা.) তো কোন জাল, দুর্বল (যঈফ) কিংবা মাওযূ’ কথা বলেননি (যে বিশ্বাস করবে, বলেছেন, সে ইসলাম থেকে ছিন্ন) তবে কেন বলা হবে ’জাল হাদীস’ ’দুর্বল হাদীস’ কিংবা ’মাওযূ হাদীস’? জাল জালই। নিজের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যে বা যারা মহানবীর (সা.) নামে মিথ্যা কিছু রচনা করবে তারা প্রবঞ্চক বা জালিয়াত এবং তাদের রচিত সেসব মিথ্যা রচনা জালিয়াতি বৈ অন্য কিছু নয়।
ইমাম বুখারী (রহ.) হতে শুরু করে সিহাহ সিত্তাহ’র সংগ্রাহকগণ প্রায় ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করেছেন কিন্তু কেউ বলেননি তাঁদের সংগ্রহের বাইরে আর কোন হাদীস নেই। কত লক্ষ হাদীস আছে তা আমরা কেউ জানি না। এখন ছয় লক্ষের বাইরের হাদীসগুলো আমরা কোথায় পাবো, সব হাদীসই তো আমাদের জন্য প্রয়োজন। সিহাহ সিত্তাহ’র হাদীসগ্রন্থ ছাড়াও আরো অনেক হাদীসগ্রন্থ আছে এবং সেগুলোতেও অনেক হাদীস লিপিবদ্ধ আছে। এখন সিহাহ সিত্তাহ’ এবং অন্যান্য হাদীসগ্রন্থের সব হাদীস-ই যে হাদীস তা বুঝতে হলে আমারও কিছু জ্ঞানের প্রয়োজন আছে যে জ্ঞান আমাকে বলে দেবে কোনটি হাদীস এবং কোনটি হাদীস নয়। আর সে জ্ঞান যদি আমার না থাকে তবে আমার উচিত হবে চুপ করে থাকা এবং জ্ঞান অর্জন করা। কারো কথায় কিংবা কোন মিডিয়ার প্ররোচনায় আমি যদি নিজেকে গড্ডলিকা প্রবাহে ভাসিয়ে দিই তবে কীভাবে আমি তাকে জ্ঞানী বলতে পারি?
এবার আসুন ”বহুল প্রচলিত কিছু জাল হাদীছ”-এর উদ্ভাবক সাহেবের প্রথম হাদীসটি নিয়ে একটু আলোচনা করি। হাদীসটি হল, ”জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীনে হলেও যাও”। অথর্ব উদ্ভাবক আরো মন্তব্য করেছেন, ”বহুল ব্যবহৃত ও বহুল প্রচারিত একটি জাল হাদিস। একটু খতিয়ে দেখলে সাধরণ চোখেই এই হাদিসটির জালিয়াতি চোখে পড়ে। রাসুলুল্লাহ সাঃ যদি সত্যিই এ কথা বলতেন তাহলে অত্যন্ত কষ্টকর হলেও চীনে অগণিত সাহাবাদের যাতায়াত থাকতো। তাছাড়া সে সময় চীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য এমন কোন জায়গা ছিলোনা যে জ্ঞানার্জনের জন্য কাছাকাছি অনেক জায়গা ছেড়ে সেখানে যেতে রাসুলুল্লাহ সাঃ বলবেন।”
অথর্ব উদ্ভাবকের হাদীস সম্বন্ধে যে কোন জ্ঞান নেই তা তার মন্তব্য পড়েই বুঝা যাচ্ছে। মহানবী (সা.) কোন জ্ঞানটি অর্জনের জন্য চীনে যেতে বলেছেন তা আগে আমাকে বুঝতে হবে। এটি কি জাগতিক জ্ঞান না ঐশী জ্ঞান? জাগতিক জ্ঞান হলে সেটা অর্জনের জন্য চীনে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আরবে কিংবা আমার দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। বাকি রইল ঐশী জ্ঞান অর্থাৎ আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং ধর্ম চেনার জ্ঞান। এ জ্ঞান কোথায় আছে? সবাই আল্লাহর কথা বলে কিন্তু পরিচয় দেবার কথা বললে আপনি আর কাউকে পাবেন না। যদি আমি জানতে পারি যে চীন নয় এর চেয়ে অনেক দূরে এমন একজন ব্যক্তি আছেন যিনি আল্লাহর পরিচয়, তাঁর রসূল এবং ধর্ম চেনার জ্ঞান জানেন, আমার কি উচিত হবে না সেখানে যাওয়া নিজেকে চেনার জন্য এবং যাবতীয় কলুষ থেকে আত্মরক্ষার জন্য? নশ্বর শরীরের সুস্থতার জন্য আমরা প্রয়োজনে অর্থ খরচ করে অনেক দূর দেশে চলে যাচ্ছি অথচ অবিনশ্বর আত্মাকে চেনার জন্য অন্য দেশে যাওয়া দূরে থাক কোন চেষ্টাও নেই আত্মার রহস্য জানার জন্য। আরবে এখন কোন জ্ঞানীরা এবং কোন সরকারেরা আছে তা আমরা খোলা চোখেই দেখতে পাচ্ছি। আসল বিষয়ের কোন খবর নেই আছে শুধু নতুন নতুন উদ্ভাবন, জায়েজ-নাজায়েজ আর জান্নাত-জাহান্নাম নিয়ে। মেয়েদের মতো বুকে হাত দিয়ে যারা নামায পড়ে তাদের আর যাই থাক কাণ্ডজ্ঞান যে নেই এটা নিশ্চিত। তাদের যে এ অবস্থা হবে তা মহানবী (সা.) জানতেন বলেই আমাদের ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন যে আরবে না থাক যদি চীনেও এ রকম কোন ব্যক্তির সন্ধান পাও যিনি আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং ধর্ম চেনার জ্ঞান জানেন তবে সেখানে হলেও চলে যেও। নচেৎ তুমিও অন্ধদের পাল্লায় পড়ে অন্ধত্ব বরণ করবে।

পত্রিকাটি আমার লেখা আর প্রকাশ করবে না (!)

চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক ও মননশীল (!) মাসিক পত্রিকা আমার ’ইসলাম, আধ্যাত্মিকতা ও সত্যপথ’ বিষয়ক ধারাবাহিক লেখা ”জ্ঞানঃ কী? কেন? কীভাবে?” শিরোনামে প্রকাশ করত। এ পর্যন্ত লেখাটির দশটি পর্ব প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি (সর্বশেষ মার্চ ২০১৬ সংখ্যায়)। এগারতম পর্বও দেয়া ছিল। পরপর দু’মাস লেখা প্রকাশ হচ্ছে না দেখে পত্রিকা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে সম্পাদক মহোদয় আমাকে জানালেন পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আমার লেখা না ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি তো হতবাক। জিজ্ঞেস করলাম আমার অপরাধটা কী। জানালেন, আমার মতো আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি নাকি এ ধরনের লেখা লিখতে পারে না! আমি আর কথা বাড়ালাম না।
মাসখানেক আগে ইসলামের অন্যমত পবিত্র স্থান এবং মহানবী (সা.)-এর শহরের নামে নামধারী ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি ইসলামিক মাসিকে ”পাঠ করুন” (লেখাটি আমার ওয়েবসাইটে আছে) শিরোনামে একটি লেখা পাঠালে সেই পত্রিকা কর্তৃপক্ষও আমার লেখাতে অনেক ভুল আছে বলে ছাপাতে অপারগতা প্রকাশ করে কিন্তু ভুলগুলো কী তা তাঁরা বলেনি।
বুঝতে পারলাম ’ইসলামিক’ চিহ্নটি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক এসব ইসলামি বেশধারী পত্রিকাগুলোর, ভেতরে সত্যের লেশমাত্র নেই পুস্তকনির্ভর কতকগুলো নিঃসাড় লেখকের কচকচানি ব্যতীত। আর ইসলাম বিষয়ে লেখার অধিকার যেন আরবী বিদ্যাপীঠের তোতাপাখি মার্কা জোব্বা-টুপি পড়া হুজুররা ছাড়া আর কারো নেই!
আসল কথা হল সত্যের প্রকাশ সবসময় কেন জানি বাধাগ্রস্ত। সত্যকে সবাই ভয় পায়। অথচ সত্য ছাড়া বাঁচার কোন উপায়ও নাই। আসুন দেখা যাক কী এমন সত্য ছিল এগারতম পর্বে যা পত্রিকাটি ছাপতে পারল না।

”জ্ঞান: কী? কেন? কীভাবে? (১১তম পর্ব)

বিভ্রান্তকারীরা আমাদের আরো শেখায় কোরআন-হাদীসেও নাকি বলা হয়েছে যে মহানবী (সা.) আমাদের মতো মানুষ! আমাদের অতি জ্ঞানী কিছু কোরআন ব্যাখ্যাকারগণও (সঙ্গত কারণেই নামগুলো বললাম না) আয়াতগুলো এবং হাদীসের গভীরে না গিয়ে যা মনে এসেছে তাই লিখে রেখেছে। অগভীর এবং আরবী জানা (!) ও না জানা মানুষেরা এসব ব্যাখ্যা কিংবা তাফসীর পড়ে পড়ে আরো বেশী বুঝে ফেলেছে এবং বলে ফেলল, নবী নাকি বড় ভাইয়ের মত! এ বিষয়ে আলোকপাতের আগে কোরআনের তাফসীর সম্বন্ধে কিছু কথা বলা জরুরী হয়ে পড়েছে। কোরআনকে ভুল ভাবে উপস্থাপন করার জন্য এসব তাফসীরগুলো কম দায়ী নয়। আরবী শিক্ষিতগণ (আমি তাঁদের ’আলেম’ বলতে রাজি নই) আপত্তি তুলতে পারেন কিন্তু আমার বক্তব্য পরিষ্কার আর তা হল আপনি না বুঝলে সোজাসুজি বলে দেন যে, ’এ আয়াতটির মর্মার্থ আমি বুঝলাম না’। কিন্তু তা না করে কোরআনকে ডাল-ভাত মনে করে যেন-তেন ব্যাখ্যা দিয়ে দেবেন তা কোন জ্ঞানীর কাজ নয়। কোরআন ঐশী গ্রন্থ আর তাই কোরআন-এর মর্ম বুঝতে হলেও লাগবে ঐশী জ্ঞান (আরবীতে যাকে বলা হয় ইলমে লাদুন্নী), তথাকথিত বিদ্যাপীঠের জ্ঞান নয়। রকেট আকাশে ওড়ে এবং বিমানও আকাশে ওড়ে, তাই বলে কিন্তু বিমান নিয়ে মহাকাশে যাওয়ার চেষ্টা করার অর্থ হল নিজেকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা। মহাকাশে যেতে রকেট লাগবেই। বিমান আকাশেই সীমাবদ্ধ। তদ্রুপ আকাশের জ্ঞান অর্জন করে একটা কিছু হয়ে গেছি মনে করে মহাকাশে যাওয়ার চেষ্টা করা বৃথা। মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অসীম। আর তাই কোরআন কোন যুগের ঘেরাটোপে আবদ্ধ থাকার গ্রন্থ নয়, কোরআন-এর বাণী সর্বযুগের জন্য চিরন্তনরূপে বিরাজ করছে। সেজন্য কোরআন হল মূলনীতি এবং সে কারণে ইসলাম সর্বযুগের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (কিছু অতি জ্ঞানী এবং নাস্তিক বা বস্তুবাদীরা বলে থাকে ইসলাম নাকি এ যুগে অচল! আসলে তারাই অচল তাদের অন্তরের অন্ধত্ব এবং অজ্ঞানতার কারণে)। যেহেতু কোরআন-এর বাণী সর্বযুগের জন্য চিরন্তনরূপে বিরাজ করছে তাই এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও সর্বযুগের জন্য উপযোগী হতে হবে। আজ থেকে এক হাজার বছর পর অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে যাবে এবং তা স্বাভাবিক। আমি যদি আমার যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞান দিয়ে কোরআনকে বিশ্লেষণ করতে যাই তবে তা হবে মারাত্মক ভুল। মনে রাখতে হবে যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল আর কোরআন চিরন্তনরূপে বিরাজ করছে। তাফসীরকারকগণ তাঁদের যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞান দিয়ে কোরআনকে ব্যাখ্যা করে গেছেন আর তা পড়ে এ একবিংশ শতাব্দীর আমি হাসছি তাঁদের জ্ঞানের দৈন্য দেখে। আমি এসব উল্লেখ করতাম না কিন্তু ভুল ভুল ব্যাখ্যা পড়ে কাউকে (বর্তমানের তথাকথিত মুক্তচিন্তা এবং ধর্মান্ধতা তথা জংলিবাদের ধারকরা) কোরআন এবং ইসলামের অবমাননা করতে দেখলে আর কত চুপ থাকা যায়। আমি এখানে শুধু তিনটি আয়াত উল্লেখ করে দেখিয়ে দেব কেন এসব তাফসীরগুলো যুগোপযোগী নয়। পর্যায়ক্রমে আরো অসংগতি তুলে ধরা হবে। প্রথমে আসুন কোরআনের ৯৬ নং সুরা আলাক্বের চতুর্থ আয়াতটিতে,
”যিনি শিক্ষাদান করেন কলম দ্বারা”।
প্রচলিত তাফসীরকারকরা উপরোক্ত আয়াতটিতে ’কলম’ শব্দটি দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন কালির কলম যা দ্বারা কথা লিখে রাখা হয়। বলা হয় শিক্ষার বাহন কলম। আগে মানলেও কথাটি আমি এখন মানবো না। আজ থেকে ছয় বছর পূর্বে আমি লেখালেখির ক্ষেত্রে কলমের ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছি। কর্মস্থলের কাজে শুধু সই করা ব্যতীত কলমের আর কোন ব্যবহার নেই। আর সামনে যদি বায়োমেট্রিক সই চালু হয়ে যায় তবে চেকেও আর সই করা লাগবে না, আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে সব কাজ হয়ে যাবে। যেহেতু কলমের ব্যবহার নেই তাই খাতা অর্থাৎ কাগজও নেই। কাগজ-কালি এখন আমার কাছে অচল। বিজ্ঞানের এক চমৎকার আবিষ্কার হাতে বহনযোগ্য আধুনিক আলাপনী (ইংরেজিতে যাকে বলা হয় Smartphone) কেনার পর আমার জীবনধারাই পাল্টে গেছে। আমি এখন ব্যবহার করছি দেশী ব্রান্ড (সবসময় দেশীয় পণ্য ব্যবহার করতে চেষ্টা করি) সিম্ফনির ফেবলেট (Phablet-ট্যাবলেট স্মার্টফোনের ছোট্ট সংস্করণ)। প্রথমেই বন্ধ করে দিয়েছি দৈনিক সংবাদপত্র আর বিক্রি করে দিয়েছি বহুদিনের কষ্ট করে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা অনেক বই-পত্র কারণ পত্রিকা এখন পড়ি বাসায় থাকলে ল্যাপটপে আর বাইরে কিংবা যানবাহনে থাকলে ফেবলেটে, একই ভাবে বইও। লেখার কোন বিষয় মনে হলে টুকে রাখি ফেবলেটের নোটসে যেখানে বাংলাতেও লেখা যায়। কোন তাৎক্ষণিক সংবাদ জানতে কারো কাছে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই, আছে মোবাইল ইন্টারনেট। খুঁজলেই পাওয়া যাবে। কোন ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছেন না, দরকার নেই কারো কাছে জিজ্ঞেস করার, আছে মোবাইল মানচিত্র, জায়গার নাম লিখে দিলে আপনাকে মানচিত্র আকারে রাস্তা-ঘাট সব দেখিয়ে দেবে। এ লেখাটিতে তথ্যসূত্র হিসেবে যেসব বইয়ের নাম আমি দিচ্ছি কিংবা সামনে দেব সেসব কোন কাগজের বই নয়, সবগুলোই ই-বুক (Electronic Book) বা পিডিএফ নথি (PDF File)। হাজার টাকার ডাটা (সজনে ডাটা ভেবে আবার ভুল করবেন না! Data বলতে এখানে বুঝিয়েছি ইন্টারনেট খরচের হিসাব) খরচ করে এসব ই-বুক এবং পিডিএফ নথি আমার কিনতে হয়েছে। আমার ল্যাপটপে হাজারের উপর ই-বুক সংরক্ষিত আছে আর ফেবলেটটাকে তো রীতিমতো ছোট্ট একটা পাঠাগার (Library) বানিয়ে ফেলেছি। যদি এগুলো কাগজের বই হতো তবে ঘরে আর থাকতে হতো না, ভাড়া বাসায় কি আর বই রাখার জন্য আলাদা কক্ষ পাওয়া যায়। আর ইন্টারনেট থাকলে বিশ্বের বিভিন্ন ই-পাঠাগারে (Electronic Library) ঢুকে বই পড়া আটকায় কে। এভাবে আছে আরো অনেক সুবিধা। কাগজ আর কালির কোন ভূমিকা-ই নেই। আপনাদের অজানা নয় যে উন্নত বিশ্বের অনেক বিখ্যাত সংবাদপত্রের কাগুজে সংস্করণ এখন বন্ধ। সবাই এখন অনলাইনে চলে গেছে। উন্নত বিশ্বের অনেক বিদ্যাপীঠের শ্রেণীকক্ষে ছেলে-মেয়েদের ল্যাপটপের মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হয়। কোথাও জানি দেখেছিলাম বিজ্ঞানীরা এখন এমন কম্পিউটার বা ল্যাপটপ বানানোর চেষ্টা করছেন যেখানে আপনাকে কষ্ট করে লিখতেও হবে না। মনে মনে বলবেন আর লেখা হয়ে যাবে। আমি মোটেই অবাক হচ্ছি না। কয়েক বছরের মধ্যেই হয়ত আমরা এ ধরনের প্রযুক্তি পেয়ে যেতে পারি। এত কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই, দেখা যাচ্ছে কাগজ আর কালির ব্যবহার দিন দিন সীমিত হয়ে আসছে, হয়ত একসময় নাও থাকতে পারে। আমি আগেই বলেছি মহান আল্লাহর জ্ঞান অসীম। আমাদের চেনা জগতের প্রারম্ভ থেকে যবনিকা পর্যন্ত সমস্ত জ্ঞান মহান আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত। তিনিও কিন্তু জানেন যে একসময় কালি-কলমের ব্যবহার ফুরিয়ে আসবে। তবে কেন তিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষাদানের কথা বললেন? এ কোন কলম? বুঝা যাচ্ছে এ কলম সে কলম নয় যা কাগজে লিখে। মহানবী (সা.)-এর কাছে মহান আল্লাহ যখন কোরআন নাযিল করছেন তখন তো তিনি নবী (সা.) কে বলেননি যে কাগজ-কালি নিন, লিখে রাখুন। বরং বলেছেন,
”বস্তুত এ হচ্ছে কোরআন মাজিদ, লৌহের মধ্যে হেফাযতপ্রাপ্ত” [সূরা বুরূজ, আয়াত: ২১-২২]।
’লৌহ’ শব্দের অর্থ স্মৃতিফলক। যেহেতু কোরআন এ স্মৃতিফলকে সংরক্ষিত সুতরাং একে লিখে রাখার কিংবা মুখস্থ রাখার কোন দরকার নেই। মহান আল্লাহর বাণী আল্লাহই প্রচার করবেন। কিন্তু সম্মানিত সাহাবারা এ কোরআন মুখস্থও রেখেছিলেন এবং লিখেও রেখেছিলেন, কারণ আর কিছুই নয়, আমাদের জন্য। আমরা যতই জ্ঞানের অধিকারী হই না কেন সম্মানিত সাহাবাগণের স্তরে পৌঁছা আমাদের পক্ষে কস্মিনকালেও সম্ভব নয়, সমালোচনা তো দূরের কথা। আরেকটি কথা এখানে বলে রাখা ভাল, কোরআন মহানবী (সা.)-এর উপর নাযিল হয়েছিল নবীর শিক্ষার জন্য নয়, আমাদের জন্য। মহানবী (সা.) শিক্ষকদের শিক্ষক, তাঁকে শিক্ষক করেই আমাদের মাঝে প্রেরণ করা হয়েছে। নবীকে যদি শিখতে হয় তো তিনি আমাদের কখন শেখাবেন! সুতরাং নবী (সা.)-কে শিক্ষাদানের কোন ব্যাপার এখানে নেই। অথচ আমাদের কিছু অতি জ্ঞানীরা কোরআনের ৭৫ নং সুরা ক্বেয়ামতের ষোড়শ, সপ্তদশ ও অষ্টদশ আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যায় বলেন, কোরআন নাযিলের সময় এর আয়াত মুখস্থ করার জন্য নবী (সা.) নাকি ঘন ঘন জিহ্বা নাড়তেন যেন ভুলে না যান! মহান আল্লাহ নাকি নবীকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলেছেন, এ কোরআন পাঠ করানোর দায়িত্ব আল্লাহর! নাযিলের সময় প্রথমে ফেরেশতা জিবরাঈল পাঠ করবেন এরপর নবী! অথচ পুরো ক্বেয়ামত সুরাটি মানুষের মৃত্যু ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। কোরআন পাঠের কোন আলামত আয়াত তিনটিতে নেই। আসুন আয়াতগুলো পাঠ করি,
”তুমি তোমার জিহ্বা এ বিষয়ে সঞ্চালন করো না একে ত্বরান্বিত করার জন্য। ইহা সংরক্ষণ করার ভার আমাদের উপর এবং এর ঘোষণাও। অতএব আমাদের ঘোষণা হওয়ার পর তুমি ঐ ঘোষণা অনুসরণ করিও” [সুরা ক্বেয়ামত, আয়াত: ১৬-১৮]।
আয়াত তিনটি খুবই রহস্যময়। খোলাসা করতে গেলে অনেক গোপন প্রকাশ হয়ে পড়ে তাই নীরবতাকে শ্রেয় মনে করলাম। এবার কলমে আসি। সুরা আলাক্বের চতুর্থ আয়াতটিতে যে কলমের কথা বলা হয়েছে তাও রহস্যময়। তবু একটু বলছি। শিক্ষাদান করেন কলম দ্বারা। শিক্ষার সাথে কলম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে কোরআনের এ কলম দিয়ে কাগজে লেখা না গেলেও অন্য আরেকটি স্থানে লেখা যায় আর তা হল মানুষের ক্বলব বা হৃদয়। এ কলমের অপর নাম ঈমানী শক্তি।”