সুন্নী, ওয়াহাবী, শিয়া, তাবলীগি, জামায়াতী, তালেবানী, আইএসআইএস ইত্যাদি আসলে কী?

”হে ঈমানদারেরা, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া কর, খাঁটি তাকওয়া এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০২)।
ভাল করে আয়াতটি লক্ষ্য করুন, ঈমানদারদের উদ্দেশ্য করে মহান আল্লাহ বলছেন তারা যেন আল্লাহর খাঁটি তাকওয়া করে এবং অবশ্যই যেন মুসলমান হয়ে মৃত্যুবরণ করে। কোরআনে যাবতীয় আদেশ-উপদেশ (যেমন সালাত, সাওম, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি) সবই ঈমানদারদের উদ্দেশ্য করে। সাধারণ মানুষদের প্রতি একটিই নির্দেশ- তারা যেন আগে ’ইনসান’ কিংবা ’ঈমানদার’ হয়। কারণ যতক্ষণ একটি মানুষ ’ইনসান’ কিংবা ’ঈমানদার’ হতে পারছে না ততক্ষণ তার দ্বারা কোরআন কিংবা কোরআনের নির্দেশ মানা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ তার দ্বারা নামায-রোযা কিছুই হবে না। যদিও আমরা দেখি বর্তমানে মসজিদে নামাযী বেড়েছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে অধিকাংশই সুদ কিংবা অন্যান্য অপকর্মে নিজেদের আকণ্ঠ নিমজ্জিত রেখেছে। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে লেখা আছে ’যতদিন ঔষধ সেবন করিবেন ততদিন গরুর গোস্ত, চিংড়ি মাছ খাওয়া নিষেধ।’ এখন আপনি খেতে বসে গরুর গোস্ত, চিংড়ি মাছকে যদি উপেক্ষা করতে না পারেন আপনার রোগ কি ভাল হবে? কোরআনে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়া তো দূরের কথা নামাযের ধারে-কাছে যেতেও নিষেধ করা হয়েছে। এখন আপনি সুদের নেশা, ঘুষের নেশা, নারীর নেশা, টাকার নেশা ইত্যাদি নেশায় আক্রান্ত হয়ে নামাযে দাঁড়ালে কস্মিনকালেও ’ইনসান’ কিংবা ’ঈমানদার’ হতে পারবেন না। আর ’ঈমানদার’ হতে না পারলে ’মুসলমান’ হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। অথচ আমাদের সেই আদ্যিকালের ধারণা (কুসংস্কার) এই যে মুসলমান নামধারীর ঘরে জন্মগ্রহণ করতে পারলেই কেল্লাফতে, আমিও মুসলমান! এসব ফালতু চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে ’সাধারণ মানুষদের’ কোরআন কী বলে সম্বোধন করেছে। কোরআন ’সাধারণ মানুষদের’ বিভিন্ন নামে সম্বোধন করেছে। নামগুলো যদি এক এক করে বলতে যাই আপনারা থমকে যাবেন। হক এবং সত্য কথনে মহান আল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট। এতে কে খুশি হচ্ছে আর কে বেজাড় হচ্ছে তাতে তাঁর বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। নামগুলো ইচ্ছে করেই এ লেখাতে বলছি না। এক একটি নাম নিয়ে এক একটি পর্ব লেখার ইচ্ছে আছে ইনশাআল্লাহ।
কোরআন ’তেলাওয়াত’ (পড়া), অনুবাদ, তাফসীর কিংবা জানার জন্য আসেনি, এসেছে মানার জন্য। আপনি অত্যন্ত শুদ্ধ করে সুমধুর সুরে কোরআন পড়তে পারেন এতে আহামরি হওয়ার কিছু নেই। আরবের লোকেরা আপনার চেয়ে ঢের বিশুদ্ধ করে কোরআন পড়তে পারে অথচ তাঁরা বন্ধু হিসেবে বেছে নিয়েছে খ্রিস্টান আর ইহুদীদেরকে যা কোরআনের চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। আপনি খুব কোরআন জানেন, অনুবাদ কিংবা তাফসীর করে বাজারে ছেড়ে দিয়েছেন এতেও আহামরি হওয়ার মতো কিছু নেই। গিরিশ চন্দ্র সেনও কোরআন অনুবাদ করেছেন কিন্তু মানতে পারেননি বলেই ’যে লাউ সে কদুই’ রয়ে গেলেন। আর আমরা সেই একটি মাত্র কোরআন পড়ে ভাগ হয়ে গেলাম সুন্নী, ওয়াহাবী, শিয়া, তাবলীগি, জামায়াতী, তালেবানী, আইএসআইএস ইত্যাদি মধুর মধুর নামে!
উপরোক্ত আয়াতটির প্রতি আবার আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বলা হয়েছে, মুসলমান হয়েই আমরা যেন মৃত্যুবরণ করি। বলা হয়নি সুন্নী, ওয়াহাবী, শিয়া, তাবলীগি, জামায়াতী, তালেবানী, আইএসআইএস ইত্যাদি হয়ে মৃত্যুবরণ করতে। আমরা এখন ধর্ম হিসেবে লিখি ’ইসলাম’ আর বর্ণ হিসেবে কেউ লেখে সুন্নী, কেউ শিয়া কেউ অমুক কেউ তমুক। কিন্তু কেন? ’ইসলাম’-এ তো কোন বর্ণপ্রথা নেই, কখনো ছিল না। তাহলে এগুলো কোত্থেকে এলো? কারা, কেন সৃষ্টি করল?
মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নতের উপর আমলকারীকেই সুন্নী বলা হয়। নবীর সুন্নত মানে নবী যা করেছেন তা যথাসাধ্য চেষ্টা করে অনুসরণ করা। কেন নবীকে অনুসরণ করব? সুন্নতের ছোওয়াব অর্জনের জন্য? মোটেই না। একমাত্র আল্লাহকে পাওয়ার জন্য। কারণ নবী ব্যতীরেকে আল্লাহকে খুঁজতে যাওয়া বোকামি বৈ আর কিছু নয়। ’আল্লাহ’ বলে যে একজন সত্তা আছেন তা আমরা জেনেছি নবীদের নিকট থেকে। আর তাই আল্লাহকে পেতে গেলে আমাদের সবাইকে সুন্নী হতে হবে। এখন কেউ যদি সুন্নীর দোহাই দিয়ে দল বানিয়ে নিজেদের ’আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’-এর একমাত্র প্রতিনিধি দাবী করে রাতদিন ওয়াহাবীদের গালি দিয়ে, নবী নূর না মাটি বিষয়ে তর্ক করে গলা ফাটিয়ে পকেট ভারী করার জন্য নিজের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায় তারা কীভাবে সুন্নী হতে পারে? একজন সুন্নীর কাজ হল ঈমান অর্জন করার পর কীভাবে মুসলমান হওয়া যায় সেই চেষ্টায় নিরন্তর সচেষ্ট থাকা। যারা নবীকে নবীর মর্যাদা দেয় না, কোরআনের অপব্যাখ্যা করে নবীকে আমার-তোমার মত মানুষ বানিয়ে দেয় তারা তো ইসলাম থেকে বিছিন্ন। তাদেরকে ওয়াহাবী, সালাফি, আহলে হাদীস, লা-মাযহাবী বলে দলে রাখার দরকার কী? মাতামাতি করারই বা কী দরকার? আগে নিজে নবী সম্পর্কিত বাস্তব জ্ঞান অর্জন করুন। তারপর তাদের সামনে তুলে ধরুন। মানলে ভাল না মানলে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিন। তাদের জ্ঞান কোন পর্যায়ের একটি উদাহরণ দিলে আশা করি বুঝতে পারবেন। ’কাদিয়ানী’ নামক এক নতুন মালের যখন এদেশে আগমন হল তখন তারা ঢাকার রাজপথে গলা ফাটিয়ে সমস্বরে আওয়াজ তুলল ”কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হোক”। আমার প্রশ্ন হল কাদিয়ানীরা মুসলিম ছিল কবে যে তাদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে? নিজেরই ঠিক নেই যে ’মুসলমান’ হতে পেরেছে কিনা আবার আসে আরেকজনকে অমুসলিম ঘোষণা করতে! গাধাও হাসবে!
সম্মানিত সাহাবাদেরকে আল্লাহর নবী আকাশের তারকার সাথে তুলনা করে বলেছেন তাঁদের যে কাউকেও অনুসরণ করবে হেদায়েত পাবে। অথচ কেউ কেউ (শিয়া অনুসারী) হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) ছাড়া প্রধান তিনজন সাহাবাকে (হযরত আবু বকর, হযরত উমর এবং হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) গুরুত্বই দেয় না! বাকীদের কথা না-ই বা বললাম। কী সাংঘাতিক! দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি আধ্যাত্মিক সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমার প্রিয় ইরান নামক একটি দেশে এ মতবাদটির অনুসারীরা সংখ্যাগুরু যে দেশটি নিজেকে পরিচয় দেয় ’ইসলামী প্রজাতন্ত্রী ইরান’ বলে অথচ ইসলামের মূলেই তারা কুঠারাঘাত করেছে! সাহাবারা নিজের জান-মাল দিয়ে নবীকে ভালবেসেছেন আমৃত্যু আর আমরা তাঁদের এ ত্যাগকে অনুসরণ না করে নেমে গেলাম বিভেদ তৈরীর কাজে। এ কথা সত্য যে অধ্যাত্মজ্ঞান জগতে হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর গুরুত্ব অদ্বিতীয় কারণ মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ”আমি হলাম জ্ঞানের শহর আর আলী (হযরত আলী রা.) হল সেই (জ্ঞানের) শহরের প্রবেশদ্বার”। কোন জ্ঞান? যে জ্ঞান দ্বারা মহান আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছা যায়। আমি আগেই বলেছি আল্লাহকে পেতে হলে আগে নবীকে পেতে হবে আর নবীকে পেতে হলে আলীকে লাগবেই। ”নাহজুল বালাঘা” নামক একটি গ্রন্থকে তারা খুব শ্রদ্ধা করে কারণ তাদের বিশ্বাস গ্রন্থটি হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর বক্তৃতা, পত্র আর উক্তির সংকলন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল যিনি অধ্যাত্মজগতের চরম স্তরে বিরাজ করছেন তাঁর গ্রন্থ বলে চালানো বইটিতে অধ্যাত্মজ্ঞান সম্পর্কিত একটিও বক্তৃতা, পত্র আর উক্তি নেই! ’মুতা বিবাহ’ নামক একটি জঘন্য প্রথা সেই কবে ইসলামে নিষিদ্ধ হয়েছে অথচ শিয়ারা আজো এ ’মুতা বিবাহ’ তাদের জন্য জায়েজ করে রেখেছে! বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তারাও ’ইসলাম’কে ওয়াহাবী, সালাফি, আহলে হাদীস, লা-মাযহাবীদের মতো কিছু প্রথা আর গ্রন্থে আবদ্ধ করে ফেলেছে। যেখানে বাস্তবতা নেই সেখানে কখনো সত্য অবস্থান করতে পারে না।
কয়েকটি বই আর ’বহুত ফায়দা’, ’বহুত ছোওয়াব’, ’কোন কোন আমল করলে বেহেশত নিশ্চিত’ এসব টোপ ফেলে আমাদের মাঝে বহু পূর্ব হতে একটি দল তাদের মনগড়া মতবাদ প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যার নাম ’তাবলীগ জামাত’। এবং তারা বলতে গেলে সফল নইলে ’বিশ্ব ইজতিমা’ নামক ছোওয়াবের মরিচিকাময় খনিতে কেন এভাবে দলে দলে লোক গিয়ে কষ্ট করে! শুনেছি প্রতিবছর ’বিশ্ব ইজতিমায়’ লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম হয়। আমার প্রশ্ন যদি কমপক্ষে এক লাখ করে মানুষ প্রতি বছর হেদায়েত হত তবে তো বাংলাদেশ ইসলামিক রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ার কথা। সমস্যা হল ইজতিমায় যারা বয়ান করেন তারা হলেন তাবলীগি বইয়ের পণ্ডিত আর যারা যান তারা দেখেন, শুনেন, মুনাজাত করেন তারপর চলে আসেন এবং স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন যে আমি তো বেহেশতের পথে আছি! একবার তাবলীগ জামাতের এক আমীর (স্থান, কাল, পাত্র গোপন রাখা হল কারণ ব্যক্তি আক্রমণ আমার উদ্দেশ্য নয়) আমাকে দাওয়াত দিলেন আছরের নামাযের পর বসার জন্য। আমি বসার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিলেন ঈমান বিষয়ে বয়ান হবে। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম যে, ঈমান কী। তিনি পুস্তকের কথা ধার করে ইনিয়ে বিনিয়ে যা বললেন তার সার সংক্ষেপ হল ঈমান মানে বিশ্বাস স্থাপন আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে তিনি কত বছর তাবলীগে আছেন। বললেন প্রায় নাকি পাঁচ বছর হবে। এবার আমি তাকে বললাম, পাঁচ বছর তো অনেক সময়। এ সময়ের মধ্যে আপনার তো বুঝার কথা যে ঈমান মানে হল শক্তি, ঈমানের ওজন আছে এবং মানবদেহে যখন ঈমান প্রবেশ করে তা জায়গাও দখল করে। আপনি যে ঈমানদার অর্থাৎ ঈমানওয়ালা এর কোন প্রমাণ কি আপনি পেয়েছেন নিজের মধ্যে? তিনি আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন যে আমি কীসের ভিত্তিতে এসব কথা বলছি। আমি তার উত্তর না দিয়ে আমার করা প্রশ্নের উত্তরটি চাইলে তিনি কথা না বাড়িয়ে বিনয়ের সাথে আমাকে সালাম দিয়ে পরে কথা হবে বলে সরে গেলেন!
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী যিনি ’মাওলানা মওদুদী’ নামেও পরিচিত, ছিলেন একজন গবেষক, লেখক, গ্রন্থকার, কোরআন অনুবাদক ও তাফসীরকারক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও বিংশ শতাব্দীর একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। তিনি তাঁর নিজ দেশ পাকিস্তানের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও ছিলেন। তিনি ’জামায়াতে ইসলামী’ নামক একটি রাজনৈতিক দলেরও প্রতিষ্ঠাতা যে দলটির প্রভাব আমাদের দেশেও কোন অংশে কম না। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী পণ্ডিতদের মধ্যে একজন। যেকোন গবেষকের প্রতি আমার আজীবন শ্রদ্ধার কথা আমি আগেও বলেছি কারণ জ্ঞানের পৃথিবীতে যদি কোন মৌলিক ও কঠিন কর্ম থেকে থাকে তা হল গবেষণা করা। সে হিসেবে গবেষক সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তাঁর দর্শনের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করছি। কারণ তিনি ইসলামের মূলধারা থেকে বের হয়ে একটি বৈপ্লবিক ধারার প্রবর্তন করেছেন যেখানে নৈতিকতা এবং সুমহান আদর্শের কিছুই নেই। মাওলানা মওদুদীর জনপ্রিয়তা যেমন ছিল তেমনি সমালোচনাও কম ছিল না। সমস্যা হল সমালোচনাকারী এবং যার সমালোচনা করা হয়েছে উভয়েই সত্যের ধারেকাছেও নেই। যুগে যুগে ইসলাম এসেছে প্রত্যেক মানব মনে সত্য, ন্যায় এবং নৈতিকতার বিপ্লব ঘটাতে। ইসলামের নামে দল বানিয়ে মানবে মানবে দেশে দেশে বিভেদ তৈরীর জন্য ইসলাম আসেনি। ইতিহাস অনেক বিকৃত তথ্য দিতে পারে তবে জেনে রাখা উচিত আল্লাহর নবী এবং মহান সাহাবারা কখনো গায়ের জোরে ইসলাম প্রচার করেননি এবং আগ বাড়িয়ে কোন যুদ্ধও বাধাননি তবে অন্যায়ের প্রতিরোধ করেছেন। কোরআন মতে সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ভার মু’মীনগণের উপরই ন্যস্ত করা উচিত। মু’মীন কারা? মু’মীন তিনি যিনি নবীকে নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন, যিনি নবীর গুণে গুণান্বিত এবং যিনি মহান আল্লাহর জ্ঞানে জ্ঞানী। যাঁর মধ্যে এ তিনটি গুণ থাকবে তাঁকে পৃথিবীর তাবৎ সৃষ্টি ভয় করবে। এ কারণেই হযরত উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর শাসনামলে মুসলমানরা বিনা রক্তপাতে জেরুজালেম জয় করেছিল। আর বর্তমানে আমরা অস্থায়ী ’গদির’ জন্য চতুষ্পাদ প্রাণীদের মত হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছি! ’জামায়াতে ইসলামী’ দলের প্রতি (ইসলামের প্রতি নয়) নিবেদিত প্রাণ কর্মী ছাড়া এ পর্যন্ত একজন মু’মীন আমাদের উপহার দিতে পারেনি। ’তাফহীমুল কুরআন’ মাওলানা মওদুদীর বিখ্যাত একটি কোরআন তাফসীর গ্রন্থ তবে আমার কাছে বাজারের আর দশটা তাফসীরকারকদের অন্ধের হস্তী দর্শন মার্কা কোরআন তাফসীর বলেই মনে হয়েছে। উদাহরণ না দিলে আবার আমার সমালোচনা হতে পারে তাই দুটি আয়াতের উল্লেখ করব। মাওলানা মওদুদী সূরা ফাতিহার ২য় আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে-
অনুবাদ: ”যিনি পরম দয়ালু ও করুণাময়”
ব্যাখ্যা: ”মানুষের দৃষ্টিতে কোন জিনিস খুব বেশী বলে প্রতীয়মান হলে সেজন্য সে এমন শব্দ ব্যবহার করে যার মাধ্যমে আধিক্যের প্রকাশ ঘটে। আর একটি আধিক্যবোধক শব্দ বলার পর যখন সে অনুভব করে যে ঐ শব্দটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জিনিসটির আধিক্যের প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি তখন সে সেই একই অর্থে আর একটি শব্দ ব্যবহার করে। এভাবে শব্দটির অন্তর্নিহিত গুণের আধিক্য প্রকাশের ব্যাপারে যে কমতি রয়েছে বলে সে মনে করছে তা পূরণ করে। আল্লাহর প্রশংসায় ’রহমান’ শব্দের পরে আবার ’রহীম’ বলার মধ্যেও এই একই নিগূঢ় তত্ত্ব নিহিত রয়েছে। আরবী ভাষায় ’রহমান’ একটি বিপুল আধিক্যবোধক শব্দ। কিন্তু সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর রহমত ও মেহেরবানী এত বেশী ও ব্যাপক এবং এত সীমাসংখ্যাহীন যে, তা বয়ান করার জন্য সবচেয়ে বেশী ও বড় আধিক্যবোধক শব্দ ব্যবহার করার পরও মন ভরে না। তাই তার আধিক্য প্রকাশের হক আদায় করার জন্য আবার ’রহীম’ শব্দটিও বলা হয়েছে। এর দৃষ্টান্ত এভাবে দেয়া যেতে পারে, যেমন আমরা কোন ব্যক্তির দানশীলতার গুণ বর্ণনা করার জন্য ’দাতা’ বলার পরও যখন অতৃপ্তি অনুভব করি তখন এর সাথে ’দানবীর’ শব্দটিও লাগিয়ে দেই। রঙের প্রশংসায় ’সাদা’ শব্দটি বলার পর আবার ’দুধের মতো সাদা’ বলে থাকি।” [তাফহীমুল কুরআন]

এবার বিশ্লেষণে আসি। বস্তুত ’রহমান’ এবং ’রহীম’ মহান আল্লাহর দুটি গুণবাচক নাম তাই এ পবিত্র নাম দুটোর অনুবাদে পরম দয়ালু কিংবা করুণাময় কিংবা অন্য আরো কিছু উল্লেখ না করে ’আর রহমান’ এবং ’আর রহীম’ উল্লেখ করাই শ্রেয়। কেন শ্রেয় এর কারণ জানতে হলে আমাদেরকে আরো গভীরে যেতে হবে। জানতে হবে ’রহমান’ কী এবং ’রহীম’ কী। ’রহমান’ তিনি যিনি,
”আর রহমান। শিক্ষা দেন আল কোরআন। রূপান্তর করেন ইনসান। শিক্ষা দেন বয়ান।” (সূরা আর রহমান, আয়াত: ১-৪)
’রহীম’ তিনি যিনি,
”এটি শক্তিশালী রহীম হতে নাযেল।” (সূরা ইয়া-সিন, আয়াত: ৫)
পাঠক গভীরভাবে লক্ষ্য করুন, ’রহমান’ কোরআন শিক্ষা দেন আবার বয়ানও শিক্ষা দেন আর ’রহীম’ কোরআন নাযিল করেন। কোরআন শিক্ষা আর কোরআন নাযিল এক বিষয় নয়। কোরআন শিক্ষা দেয়া সহজ কিন্তু কোরআন নাযিল অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। আর তাই ’রহীমের’ আগে ’শক্তিশালী’ বিশেষণ আছে যা রহমানের আগে নেই। আরো অনেক গুপ্তভেদ আছে যা সাধারণ্যে প্রকাশযোগ্য নয়।
সূরা মুহাম্মদ-এর ১৯নং আয়াত মাওলানা মওদুদী অনুবাদ করেছেন এভাবে-
”অতএব, হে নবী! ভাল করে জেনে নাও, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ইবাদাতের যোগ্য নয়। নিজের ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।”
আপনি যদি আরবী না জানেন তবে কোন আরবী জানা লোকের সাহায্য নিয়ে আয়াতটি একবার আরবীতে পড়ে দেখুন, দেখবেন আয়াতটির শুরু কিংবা শেষ কোথাও নবী বা রসূল শব্দটি নেই। নবীর উপর কোরআন নাযিল হয়েছিল আমাদের হেদায়েতের জন্য, নবীর হেদায়েতের জন্য নয়। আয়াতটিতে আমাদেরকেই বলা হচ্ছে যে, নেই কোন ইলাহ আল্লাহ ব্যতীত এবং নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাও। যিনি জেনে শুনেই পৃথিবীতে প্রচার করতে আসলেন যে, ’আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই’ তাঁকেই কিনা আবার বলা হচ্ছে যে, ’ভাল করে জেনে নাও, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ইবাদাতের যোগ্য নয়’! আরো উদাহরণ দেয়া যেত পাছে আবার ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যায়! অনুবাদের যদি এই হাল হয় তো তাঁর বাকি কর্মের কী হাল হবে তা সহজেই অনুমেয়। শুনেছি তাঁর গায়েবানা জানাজার নামায পবিত্র কাবাতে পড়া হয়েছিল। পবিত্র কাবা আরবে অবস্থিত আর আরবের লোকদের বর্তমান অবস্থা আগেই উল্লেখ করেছি। এবার বুঝে নিন মাওলানা মওদুদী আসলে কোন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও ’ইসলাম’ নামটিকে পুঁজি করে আরো অনেক দল এদেশে আছে তাদের মধ্যে কেউ নেমেছে ইসলামকে হেফাজত করতে (কোরআন বলেছে ইসলামে প্রবেশ করে নিজেকে হেফাজত করতে), কেউ নেমেছে ইসলামি শাসনতন্ত্র কায়েম করতে, কেউ নেমেছে খেলাফত কায়েম করতে ইত্যাদি। সবাই আছে ইসলাম বাঁচানো আর ইসলাম কায়েমের তালে কিন্তু নিজেকে যে আগে বাঁচাতে হবে যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি, নষ্টামি আর লোভ-লালসা হতে এ শিক্ষা কারো মাঝে নেই। থাকলে তারা নিজেদের মাঝে হানাহানিতে লিপ্ত হতো না, লিপ্ত হতো না সামান্য গদির লোভে নারীর আঁচলের নীচে নিজেদের সঁপে দিতে।

সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর যুগে মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য খ্রিস্টানরা তাদের নিজেদের দলের লোকদের আরবী শিক্ষায় শিক্ষিত করে মুসলমানদের মসজিদে ইমাম হিসেবে পাঠাত। চিন্তা করুন, মসজিদের ইমামতি করছে অথচ আদতে খ্রিস্টান। এবার দৃষ্টি দিন বর্তমানকার তালেবান, আল কায়েদা কিংবা আইএসআইএসদের দিকে। মনে হবে যেন ইসলাম কায়েম করে ফেলছে অথচ আদতে ইহুদী-খ্রিস্টানদের পোষ্যপুত্র। অমুক মসজিদের ইমাম, বিখ্যাত আলেমেদ্বীন, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসিরে কোরআন ইত্যকার বিশেষণ শুনে এত উৎসাহিত হওয়ার কিছু নেই। আগে যাচাই করে দেখুন আদতে তারা কোন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছে।

ইসলাম পূর্ব যুগে ’আবু জেহেল’ (অর্থ মূর্খের বাবা)-এর নাম ছিল ’আবু হাকাম’ অর্থাৎ জ্ঞানের বাবা (তার আসল নাম আমর ইবনে হিশাম)। ইসলামের নবী সত্য প্রচারে নেমে সত্যটিকে অর্থাৎ ঈমান ও ইসলামের বাস্তবতা প্রমাণ সহকারে দেখিয়ে দিলেন তখন কথিত ’জ্ঞানের বাবার’ জ্ঞান যখন ধরা খেয়ে তার এতদিনের ’আবু হাকাম’ গদি যায় যায় অবস্থা ওই সময় থেকেই ’আবু হাকাম’ ইসলাম বিরোধীতায় নেমে গেল সত্য জানার পরও। মনে রাখা উচিত জ্ঞান সত্যের অনুগামী, সত্য যেখানে জ্ঞানও সেখানে। ’জ্ঞানের বাবা’ সত্যের বিরোধীতা করলে তাকে তো তখন মূর্খের বাবা নামেই ডাকতে হয়। কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য একটাই আর তা হল বিজ্ঞান যেরূপ প্রমাণে বিশ্বাসী তদ্রুপ ’ইসলাম’ও। যারা ’ইসলামকে’ আউল-ফাউলদের মত কতগুলো অন্ধবিশ্বাসের যপতপ মার্কা সৈনিকদের মত পাঁচ ওয়াক্ত লেফট-রাইট ধর্ম বলে প্রচার করতে চায় এখনো সময় আছে তাদের উচিত নিজেকে শোধরিয়ে আগে ঈমান অর্জন করা।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s