হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম এবং সকল মানবজাতির প্রতি – ৩য় পর্ব

[এ পর্বটি পড়ার পূর্বে অবশ্যই ১ম ও ২য় পর্বগুলো পড়ে নেবেন। না পড়ে না বুঝে সমালোচনা করে দয়া করে নিজেকে ছোট করবেন না।]
যুগে যুগে ধর্ম প্রচারের জন্য যেসব মহাপুরুষরা এসেছিলেন তাঁরা আসলে কোন ধর্মটি প্রচার করেছেন? আমি আগেই বলেছি দর্শনের প্রশ্নে চারটি ধর্ম একটি স্থানেই দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে ধর্মগুলোর নাম ভিন্ন ভিন্ন হলো কেন? নাম তো একটিই থাকার কথা। প্রথমে হিন্দুধর্মের কথা ধরা যাক। ’হিন্দু’ বলে আসলে কোন ধর্ম নেই, ’সনাতন’ ধর্মই হল হিন্দুধর্ম। ’সিন্ধু’ পরবর্তীতে ’হিন্দু’ অঞ্চলে এ সনাতন ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এর নাম হয় হিন্দু। ইতিহাস চর্চা বাদ দিয়ে বাস্তবে আসি। হিন্দুধর্মের দর্শন কী বলে দেখা যাক-

১. ঈশ্বরের অস্তিত্বেই সকল কিছুর অস্তিত্ব এবং সকল কিছুর মূলেই স্বয়ং ঈশ্বর,

২. জীবনের উদ্দেশ্য হল আত্মা ও ব্রহ্মের অভিন্নতা অনুভব করা, আত্মা সর্বশেষে পরমাত্মা ব্রহ্মে বিলীন হয়,

৩. আত্মাকে যিনি ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন রূপে অনুভব করতে সক্ষম হন তিনিই মোক্ষ বা মহামুক্তি লাভ করেন, আত্মা ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল এবং মোক্ষ নির্ভরশীল ঈশ্বরের প্রতি প্রেম অথবা ঈশ্বরের অনুগ্রহের উপর আর মোক্ষ লাভের পথ হল বিভিন্ন ধরনের যোগ বা ধ্যান সাধনা,

৪. রাম ও কৃষ্ণ বিষ্ণুরই অবতার।

এবার আমরা বৌদ্ধ ধর্মে আলোকপাত করব। বৌদ্ধ ধর্ম দুটি প্রধান মতবাদে বিভক্ত। প্রধান অংশটি হচ্ছে হীনযান বা থেরবাদ আর দ্বিতীয়টি মহাযান নামে পরিচিত। বৌদ্ধধর্মের দর্শন কী বলে দেখা যাক-

১. উদ্ভাসিত আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং পরম জ্ঞানকে বোধি বলা হয় আর এগুলো অর্জন করতে হলে তপস্যা বা ধ্যান আবশ্যিক,

২. সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য- এটাকে নির্বাণ বলা হয়,

৩. পরকাল নির্ভর করে মানুষের ইহ জন্মের কর্মের উপর,

৪. যে সাধনা অভ্যাস দ্বারা সত্য লাভ হয়, আধ্যাত্মিকতার পূর্ণ বিকাশ হয় তাই ধর্ম।

খ্রিস্টান আর ইহুদীদের ব্যাপারে কোরআন থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি,

”নিশ্চয়ই যারা ঈমানদার এবং যারা ইহুদি এবং নাসারা (খ্রিস্টান) এবং সাবেইন যারা ঈমানের কাজ করে আল্লাহর সঙ্গে এবং আখেরাতকালের সঙ্গে এবং সৎকাজ করে তবে তাদের জন্য তাদের রবের নিকট পুরস্কার রয়েছে (সূরা বাকারা, আয়াত: ৬২ ও সূরা মায়িদা, আয়াত: ৬৯)।

এবার আসি ইসলাম ধর্মে। এ ধর্মের সারাংশ একটি বাক্যের মধ্যেই নিহিত আর তা হল,

”নেই কোন ইলাহ আল্লাহ ব্যতীত এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসূল”।

বাক্যটিকে আরবীতে ’কলেমা তাইয়্যেবা’ অর্থাৎ পবিত্র বাক্য বলা হয়। অধিকাংশ জন মনে করেন কলেমা তাইয়্যেবা পাঠ করলে কিংবা অন্তঃকরণে বিশ্বাস করলেই ঈমানদার হওয়া যায়। বহুল প্রচলিত একটি ভুল মতবাদ। বাক্যটি শুধুমাত্র পাঠ কিংবা অন্তঃকরণে বিশ্বাস করার বিষয় নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে আসবে।

পবিত্র বাক্যটির প্রথম অংশটি হল ’নেই কোন ইলাহ আল্লাহ ব্যতীত’। একটু ভালভাবে লক্ষ্য করুন তো হিন্দু দর্শনের প্রথম বাক্যটির সাথে সাযুজ্য পান কিনা। পরের অংশটি হল ’মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসূল’। রাম ও কৃষ্ণ বিষ্ণুরই অবতার।

’আত্মা সর্বশেষে পরমাত্মা ব্রহ্মে বিলীন হয়’ কিংবা ’সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য’ এ দু’টোর সাথে-

”নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী” (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৬) আয়াতটির মিল নেই?

আবার পবিত্র কোরআনে আছে,

”এবং মনে করিও না তারা মৃত, যারা আল্লাহর পথে কতল হয়। বরং তারা জীবিত রবের নিকট রেজেকপ্রাপ্ত” (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৬৯),

”ওহে ঈমানদারগণ তাকওয়া কর আল্লাহর নিরেট তাকওয়া এবং তোমরা মৃত্যুবরণ করিও না আত্মসমর্পিত না হয়ে” (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১০২),

আয়াতদ্বয়ের সাথে বৌদ্ধধর্মের দর্শন ’উদ্ভাসিত আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং পরম জ্ঞানকে বোধি বলা হয়’ এবং হিন্দু ধর্মের দর্শন ’আত্মাকে যিনি ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন রূপে অনুভব করতে সক্ষম হন তিনিই মোক্ষ বা মহামুক্তি লাভ করেন’ – এর সামঞ্জস্য নেই?

হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্ম হল বিশ্বের মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ধর্ম। এরপর আসে ইহুদী আর খ্রিস্টান ধর্ম। প্রত্যেক ধর্মেই দেখা যাচ্ছে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট হতে একজন প্রতিনিধি এসে মানুষদের ধর্ম কিংবা মানুষের প্রভুর পরিচয় দান করেছেন যাঁদেরকে আমরা অবতার কিংবা কৃষ্ণ বিংবা বুদ্ধ কিংবা রসূল বলি। পবিত্র কোরআনে আছে,

”এবং রসূলগণ যাঁদের কথা আপনার নিকট পূর্বেই বর্ণনা করেছি এবং (আরও) রসূলগণ যাঁদের কথা আপনার নিকট বর্ণনা করিনি …, রসূলগণ হলেন সুসংবাদদাতা এবং সাবধানকারী যেন মানুষের জন্য আল্লাহর উপর কোনও বিতর্ক না থাকে রসূলগণের প্রত্যাগমনের পরেও” (সূরা নেসা, আয়াত: ১৬৪-১৬৫)।

যেহেতু দেখা যাচ্ছে প্রত্যেক ধর্মের দর্শন অভিন্ন এবং প্রত্যেক ধর্মেই বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট সমর্পিত হতে উপদেশ দেয়া হচ্ছে সুতরাং ধর্ম আসলে একটাই আর সেটা হল নিজেকে প্রভুর নিকট সমর্পণ করা। যাকে বলা হয় আত্মসমর্পণ বা সমর্পিত হওয়া আর এর আরবী হচ্ছে ইসলাম, হিন্দুতে মোক্ষ, বৌদ্ধতে নির্বাণ, ইহুদী আর খ্রিস্টানদের কথা তো কোরআনেই আছে তবে শর্ত হল ঈমানের সাথে সৎকাজ করতে হবে। তাই যারা বলে পূর্বের সব ধর্ম বাতিল তারা কি আসলেই সঠিক বলছে? যদি বাতিল হয়ে যায় তবে পূর্বে আগমন করা সকল অবতারগণ, রসূলগণ যে মিথ্যা হয়ে যায়। মিথ্যা হয়ে যায় কৃষ্ণ, বুদ্ধ, আদম, নূহ, মুসা, ঈসা। পবিত্র কোরআনে আছে,

”আজ আমি তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম তোমাদের ধর্মকে এবং আমার অনুগ্রহ তোমাদের প্রতি পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকেই তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম ধর্ম” (সূরা মায়েদা, আয়াত: ৩)।

আয়াতটি ভাল করে লক্ষ্য করুন। বলা হয়েছে ’তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম তোমাদের ধর্মকে’ বলা হয়নি আগের গুলো বাতিল করে তোমাদেরটি রাখলাম। ’সম্পূর্ণ করে দিলাম’ অর্থাৎ যা এতদিন অসম্পূর্ণ ছিল সেটাকেই পূর্ণ করার কথা বলা হচ্ছে। বাতিল করা নয়। সুতরাং এতকাল ধরে ধর্ম আসলে একটিই ছিল কিন্তু অসম্পূর্ণ। আয়াতটিতে আরেকটি রহস্যময় বিষয়ের প্রতি সামান্য আলোকপাত করতে চাই আর তা হল, বলা হয়েছে ’তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম তোমাদের ধর্মকে’ বলা হয়নি তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম আমার (অর্থাৎ প্রভুর) ধর্মকে। বুঝা যাচ্ছে বিশ্বজগতের প্রতিপালক সব রকম ধর্মের ঊর্ধ্বে। কিন্তু তাঁকে পেতে হলে সমর্পিত হতে হবেই। তাই তিনি বলেন, আত্মসমর্পণই ধর্ম। ’ইসলাম’ শব্দটিকে আমরা একটি ধর্মের নামের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি কিন্তু ধর্ম অর্থই হল ইসলাম (আরবীতে) অর্থাৎ আত্মসমর্পণ।

তবে কি সব ধর্মই যার যার স্থানে ঠিক আছে এবং যে কেউ যেকোন একটি ধর্ম পালন করলেই হয়ে যাবে? মোটেই না। [চলবে]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s