কবি আল মাহমুদ’র “পথের কথা”

কবি আল মাহমুদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই লেখাটি শুরু করছি।

”তাহলে অদৃশ্য মানো, অদৃষ্টেই মেলে দাও পাখা
মানো যে নিয়ন্তা তিনি, তার হাতে জয়-পরাজয়।”
(শতাব্দীর শেষ রশ্মি, কাব্যগ্রন্থ- দ্বিতীয় ভাঙন)

জানা যায় সাহিত্যিক জীবনের প্রারম্ভিকায় কবি আল মাহমুদ বাম ঘরানার ছিলেন যাদের নীতি হল অদৃশ্যে অবিশ্বাস। ২০০০ সালে ’দ্বিতীয় ভাঙন’ কাব্যগ্রন্থ দিয়ে কবি আমাদের বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে তিনি এখন অদৃশ্যে বিশ্বাসী (!)। আমি জানি না অদৃশ্যে কীভাবে বিশ্বাস করা যায়। কবি যদি ’ইসলাম’ ধর্মের মূল বিষয়কে অদৃশ্যে বিশ্বাস বলে প্রচার করতে চান তবে আমার মতে এটি তাঁর চরম সীমাবদ্ধতা। আপনি যদি কবিতার মাধ্যমে সত্যের প্রচার করতে চান কোন অসুবিধা নেই তবে আগে দেখতে হবে আপনার ভেতর সত্য আছে কিনা। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ’ঈশ্বর’ কবিতার অংশটুকু পড়ুন-

”সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছো চোখ বুঁজে,
স্রষ্টারে খোঁজো- আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!
ইচ্ছা-অন্ধ! আঁখি খোলো, দেখো দর্পণে নিজ-কায়া,
দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে পড়েছে তাঁহার ছায়া।”

পংক্তিগুলো পড়লেই বুঝা যায় যিনি লিখেছেন তিনি সত্য বুঝেই লিখেছেন। সীমাবদ্ধতার দেয়ালে বন্দি থাকলে ’মানো যে নিয়ন্তা তিনি, তার হাতে জয়-পরাজয়’ নামক পংক্তিগুলো ব্যতীত আর কী-ই বা আশা করা যায়।

”আমার শুভানুধ্যায়ীরা বলেন, তোমার সব ঠিক আছে। এমনকি কবিতাও।
কিন্তু অসুবিধে হচ্ছে তোমার পথ নিয়ে। তোমার পথটাই অস্পষ্ট।
…….
আমার পথ এখন মাটি থেকে আকাশের দিকে মোড় নিয়েছে।
ঐ তো মেঘ, বৃষ্টি ও বিদ্যুৎচমকের মহড়া দেখছি। দেখছি ধূসর নিষ্প্রাণ
চন্দ্রমন্ডল। দুনিয়ার চেয়ে দিগুণ পরিধির সব গ্রহ নক্ষত্র। দেখছি
পরম নিশ্চিত শূন্যতার ধারণার ভেতর জ্বলে ওঠা এক রশ্মির আভাস।
সব ভরভর্তি, সব নিশ্চিত ও নিয়ন্ত্রিত। এইতো পথ
অস্পষ্টতা কোথায়? কেউ আমাকে দেখিয়ে দিন।”
(পথের কথা, কাব্যগ্রন্থ- নদীর ভিতরে নদী)

দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছি কবি এখনো অস্পষ্টতার চোরাবালিতেই আটকে আছেন। মাটি, আকাশ-এর মতো রূপক শব্দগুলো ব্যবহার করে কবি নিজেই প্রমাণ করে দিয়েছেন যে তাঁর পথটা এখনো অস্পষ্ট। আকাশে মেঘ, বৃষ্টি ও বিদ্যুৎচমক কিংবা ’শূন্যতার ধারণার ভেতর জ্বলে ওঠা এক রশ্মি’ সবাই দেখতে পায়। একজন কালজয়ী কবিও যদি আর দশটা মানুষের মতো দেখেন তবে হতাশা ছাড়া আমাদের আর কিছু থাকে না।

”বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া,
খোদার আসন ’আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!”
(বিদ্রোহী, কাজী নজরুল ইসলাম)

কবি কাজী নজরুল ইসলাম উপরোক্ত পংক্তিগুলোর ভেতর নিজের গন্তব্যের কথাই লিখেছেন মননশীলতার ছাপ রেখে আর আল মাহমুদ তার পথের কথা লিখেছেন গ্রাম্য মানুষদের সরলতার মতো করে। কবিতায় সরলতা থাকবে তাই বলে স্বকীয়তাকে বিসর্জন দিয়ে নয়।

কবি কবিতা লিখবেন কিন্তু স্কন্ধে তার সাইনবোর্ড ঝুলবে কেন? কেন তিনি সুবিধাবাদীদের কাতারে থাকবেন? পুরো বিশ্বের কবি-সাহিত্যিকদের দিকে দেখুন, হয় সুবিধাবাদী নয়তো সাইনবোর্ডধারী (ব্যতীক্রমও আছে)। অসামান্য প্রতিভা, অসাধারণ মেধার কবি আল মাহমুদ ইচ্ছে করলে নিজেকে প্রশ্নোর্ধ্ব স্থানে নিয়ে যেতে পারতেন। নদীর ভিতরে নদী কবিতায় তিনি কিন্তু জ্বলে উঠেছিলেন-

”নদীর ভিতরে যেন উষ্ণ এক নদী স্নান করে।
তিতাসের স্বচ্ছজলে প্রক্ষালনে নেমেছে তিতাসই।
নিজের শাপলা লয়ে খেলে নদী নদীর ভিতরে
ঠাট্টা বা বিদ্রুপ নেই, নেই শ্যেনচক্ষু, নেই চারণের বাঁশি।
(নদীর ভিতরে নদী, কাব্যগ্রন্থ- নদীর ভিতরে নদী)

লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালি কাবিন এর মতো কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্য হয়ত আর পাবে না। কিন্তু মননশীলতার যে জায়গাটুকু ছিল সেটাও যে কলুষিত হয়ে গেল এর দায়ভার কার? কবির না পারিপার্শ্বিকতার?

”হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোন কবি করে না কসুর।”
(সোনালি কাবিন)

Advertisements

কেন আপনাকে কবরস্থ করতে হবে?

প্রাণী মাত্রই মারা গেলে পচন ধরে- তা মাটিতে পুঁতে ফেলা হোক কিংবা মাটির উপরে রাখা হোক। প্রাণীদের কোন জানাজা-দাফন নেই, নেই কোন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কিংবা সৎকার। মরে গেলে পচে যাবে এবং একসময় মাটির সাথে মিশে যাবে, অতএব এত আয়োজনের কী দরকার, তাই না? মানুষও একপ্রকার উন্নত (!) প্রাণী। মানুষও মারা গেলে পচে যায় (!) এবং একসময় মাটির সাথে মিশে যায় কিন্তু তার জন্য এত আয়োজন কেন? কেন এত জানাজা, পবিত্র গ্রন্থ থেকে মন্ত্র উচ্চারণ, চিতা কিংবা দাফনের আয়োজন, কবরস্থান কিংবা সমাধির ব্যবস্থা? অন্য আর দশটা প্রাণী যেমন বাঘ, শুয়োর, হরিণ, ঘোড়া, গরু ইত্যাদি মারা গেলে যেমন পচে যায় তেমনি মানুষেরও তো একই পরিণতি হচ্ছে। তো আর দশটা প্রাণী হতে মানুষ আলাদা কোথায়? বলবেন মানুষ উন্নত (!) প্রাণী, সে বড় বড় ডিগ্রী নিতে পারে, ভবিষ্যতে পৃথিবীর বাইরে থাকার পরিকল্পনা করছে। বাঘ, শুয়োর, হরিণ, ঘোড়া, গরু কি এগুলো পারবে? সবই মানলাম কিন্তু আমার সমস্যা অন্য জায়গায়। মারা যাবার পর তার বড় বড় ডিগ্রী কিংবা পৃথিবীর বাইরে থাকা তো কোন কাজে আসছে না। সে তো আর দশটা প্রাণীর মতোই পচে যাচ্ছে, তার জন্য এত আয়োজন কেন? জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসলে তো হয়। অন্ততঃ মাংসাশী প্রাণীগুলোর আহার্যের যোগান হবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অনেক বাঙ্গালীর মৃতদেহ দাফন কিংবা সৎকারের অভাবে মাটিতে পড়ে ছিল এবং একসময় সেগুলো মাটির সাথে মিশে গিয়েছে।
আমি বুঝতে পারছি এতটুকু পড়তে গিয়ে আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে। কাউকে কষ্ট দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। বিবেকের সম্মুখে পৃথিবীর মানুষদের দাঁড় করিয়ে দেয়ার জন্যই এই লেখা।
পবিত্র কোরআন অনুযায়ী মু’মিন কিংবা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করলে আপনার জন্য যত আয়োজনই করা হোক না কেন যেমন- আগরবাতি জ্বালানো, পবিত্র গ্রন্থ থেকে আবৃত্তি, দাফন কিংবা চিতার জন্য কাঠ বা অন্যান্য সামগ্রী, আলিশান কবর বা সমাধির ব্যবস্থা ইত্যাদি সবই বেকার। বলে রাখা ভাল ইসলাম ধর্মের অনুসারী পিতা-মাতার ঘরে জন্মগ্রহণ করলে কিন্তু মু’মিন কিংবা মুসলিম হয় না যেভাবে চিকিৎসকের সন্তান চিকিৎসক হয়ে জন্ম নেয় না। তাকে লেখাপড়ার মাধ্যমে চিকিৎসক হতে হয়। ঠিক মু’মিন কিংবা মুসলিম হয়ে কেউ জন্ম নেয় না। সাধনা আর চরিত্র বলে মু’মিন কিংবা মুসলিম হতে হয়।
হাদীস শরীফে উল্লেখিত কবর জিয়ারতের দোয়াটি ভাল করে আরেকবার পড়ে দেখুন তো কী বলা হয়েছে- ”আসসালামু আ’লাইকুম আহলাদ্দিয়ারি মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা …” অর্থাৎ ’হে গৃহসমূহের অধিবাসী মু’মিন ও মুসলিমগণ, তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।’ হাদীসে মিনান ’নাস’ (মানুষ), মিনাল ’ইনসান’ (মানুষজাতি), মিনাল ’আমানু’ (ঈমানদার) ইত্যাদি তো বলা হল না। বলা হয়েছে শুধু ’মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা’।
এবার পবিত্র কোরআন শরীফটি রেহেল থেকে নামিয়ে শুধু রোযার মাসে ছো-ও-য়া-বে-র উদ্দেশ্যে না পড়ে একটু খুলে দেখুন তো কী লেখা আছে। কোরআন বলছেন,
”নিশ্চয়ই মু’মিনরা সফলকাম” (সূরা মু’মিনুন, আয়াত: ১),
”ওহে ঈমানদারগণ তাকওয়া কর আল্লাহর নিরেট তাকওয়া এবং তোমরা মৃত্যুবরণ করিও না মুসলিম না হয়ে” (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১০২)।
পুরো কোরআনে ’ইনসানরা সফলকাম’ কিংবা ’ঈমানদাররা সফলকাম’ কিংবা ’নাসরা সফলকাম’ কিংবা ’আলেম, মুফতি, হাফেজ, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদরা সফলকাম’ নামক কোন বাক্য আপনি পাবেন না। আবার ’ইনসান না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না’ কিংবা ’নাস না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না’ কিংবা ’ঈমানদার না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না’ কিংবা ’আলেম, মুফতি, হাফেজ, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না’ নামক বাক্যও আপনি পাবেন না। দেখা যাচ্ছে কোরআন এবং হাদীস একই সুরে কথা বলছেন। বলবেনই তো কারণ,
”তিনি (নবী) প্রবৃত্তি (নিজ ইচ্ছামত) হতে কথা বলেন না” (সূরা নজম, আয়াত: ৩)।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যদি নিজ প্রবৃত্তি হতে কথা না বলেন তবে তিনি কোন প্রবৃত্তি হতে কথা বলেন? কোরআন কেন বারবার আল্লাহর সাথে সাথে নবীকেও অনুসরণ করতে বললেন বুঝতে পারছেন কি? এরপরও কোন দল কিংবা গোষ্ঠি যদি বলে যে ’আল্লাহ আমার রব তিনি মোদের সব’ কিংবা ’আল্লাহ ছাড়া আর কোন কিছু মানি না’ বুঝতে হবে এখানে শয়তান ঢুকে গেছে। আদমের সামনেই শয়তান বলেছিল ’আল্লাহ ছাড়া আর কোন কিছু মানি না’ তাই সে মাটির (!) তৈরী আদমকে সেজদা দেয়নি। অনেক তাফসীরকারক মু’মিন, মুসলিম এবং ঈমানদারকে এক করে ফেলেছেন তাঁদের কোরআন ব্যাখ্যায় (!)। মাদ্রাসা কিংবা আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের তোতা পাখি মার্কা বিদ্যা অর্জন করে কোরআন ব্যাখ্যায় হাত দিতে গেলে এমনই হবে। কোরআন যে স্থান হতে নাযিল হয়েছে সে স্থান সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকলে কীভাবে একজন মানুষ কোরআনের মত একটি মহাজ্ঞানভান্ডারের রহস্য উন্মোচনে হাত দেন? তাঁদের বুক কি এতটুকু কাঁপেনি? আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে কোরআনের পাঁচটি তাফসীর গ্রন্থ থাকার পরও একটি আয়াতের অনুবাদে আমাকে পনের থেকে বিশটি কোরআন সম্পর্কিত ওয়েবসাইটে যেতে হয় শুধু এ ভয়ে যে যদি আমি মহাশক্তিমানের বার্তা ভুল ভাবে উপস্থাপন করি তবে তো আমার বারোটা বেজে যাবে। এজন্য প্রায়ই চিন্তা করি লেখালেখি বন্ধ করে দেব, কী দরকার এত কষ্ট করার, লোকজনের কাছে সত্য সন্ধানের চেয়ে টাকার সন্ধানই এখন বড়। কিন্তু ভেতর থেকে কে যেন বলে তোমাকে সত্যের সন্ধান দেয়া হয়েছে চুপচাপ বসে থাকার জন্য নয়।
আমি ওদিকে যাবো না, আমার প্রসঙ্গ কবর সম্পর্কিত। আমাদের সেখানো হয়েছে কোন কবরস্থানের পাশ দিয়ে গেলে কবরবাসীকে যেন সালাম দিই এ বলে যে ”আসসালামু আ’লাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর”। আপনি কাকে সালাম দিচ্ছেন? কবরে যিনি আছেন তাকে? তিনি তো কবেই মাটির সাথে মিশে গেছেন! হাড্ডি থাকলেও থাকতে পারে। আরো বড় প্রশ্ন হল সালাম কার জন্য – জীবিত না মৃত ব্যক্তির জন্য। অবশ্যই জীবিত ব্যক্তির জন্যই সালাম। কারণ সালাম দিলে উত্তর দেয়ার প্রশ্ন জড়িত। যিনি কবরেই নেই কিংবা কোথায় আছেন তাও আপনার জানা নেই তো তাকে আবার সালাম কেন? তার জন্য আপনি বড়জোড় দোয়া করতে পারেন কোরআন শরীফ থেকে কিছু আয়াত এবং দরূদ শরীফ পাঠান্তে। সালাম শুধুমাত্র জীবিত ব্যক্তির জন্য। তবে হাদীস শরীফে কবর জেয়ারতের দোয়ায় যে সালাম দেয়া হল সেটার কী হবে। ভাল কথা। দেখতে হবে হাদীসে কোন ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশ্যে সালাম দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ’মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা’ অর্থাৎ ’মু’মিন’ এবং ’মুসলিম’ আর কেউ নয়। আবার কোরআন বলছেন মু’মিনরা সফলকাম এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না। যাঁরা সফলকাম তাঁরা কি পৃথিবীতে কি পৃথিবীর বাইরে সর্বত্র সফলকাম আর মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করলে আপনি কবরেও মৃত। আর যারা আসলেই মৃত মাটি, আগুন কিংবা জীবজন্তু তাদের খেয়ে ফেলবেই যতই তাদের শান্তির উদ্দেশ্যে হাজার হাজার গরু, ছাগল, পাঠা, মহিষ, দুম্বা, মুরগী, মাছ জবাই দেয়া হোক না কেন। মু’মিন এবং মুসলিম জীবনের সর্ব পর্যায়ে একমাত্র মহান আল্লাহ ও রসূলকেই প্রাধান্য দেন, তাঁদের জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর উদ্দেশ্যেই। আর তাই তারা সর্বদা জীবিত শুধু স্থানান্তর হন। কোরআনে আছে,
”এবং মনে করিও না তারা মৃত, যারা আল্লাহর নিমিত্তে কতল হয়। বরং তারা জীবিত রবের নিকট রেজেকপ্রাপ্ত” (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৬৯)
[আয়াতটিতে ’ফী সাবিলিল্লাহ’ অর্থ ’আল্লাহর রাস্তা’ নয়, এর অর্থ ’আল্লাহর ওয়াস্তে’ বা ’আল্লাহর নিমিত্তে’। আল্লাহর রাস্তা বলে কিছু নেই। যারা বলে আছে দয়া করে তাদেরকে একটু দেখিয়ে দিতে বলবেন। রসূলকে অনুসরণই হল আল্লাহর অনুসরণ]।

তাঁরা কীভাবে জীবিত এবং কীভাবে রবের নিকট থেকে রেজেকপ্রাপ্ত হন সেটাও জানা যাবে তাঁদের কবরের নিকটে গেলে তবে আপনাকে আগে ”জীবিত” হতে হবে। পৃথিবীতে খেয়ে-পরে-বেঁচে থাকার নাম ”জীবিত” নয়। ওটা চিন্তা করলে একটি চতুষ্পাদ প্রাণীর সাথে আপনার কোন পার্থক্য থাকে না। মায়ের পেটে আপনি যখন নড়াচড়া করতেন তখন মাও বুঝতেন আপনি জীবিত। সেই জীবিত আর মায়ের পেট থেকে বের হয়ে এই জীবিত কি এক? মায়ের পেটে এক জীবন আবার মায়ের পেট থেকে যখন স্থানান্তরিত হলেন এ পৃথিবীতে তখন আরেক জীবন। এর বাইরেও আরেকটি ”জীবন” আছে আর সেটা কামেল মুর্শিদের নিকট না গেলে অধরাই থেকে যাবে। আর ওটাই শ্রেষ্ট জীবন কারণ ঐ জীবনের কোন মৃত্যু নেই আছে শুধু স্থানান্তর। এ কারণেই প্রায় চৌদ্দশ বছর পরও ১৯৩২ খ্রীষ্টাব্দে ইরাকের সালমান পাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এর সম্মানিত দুই সাহাবীর লাশ মোবারক দজলা নদীর নিকটবর্তী এলাকা থেকে তাঁদের নির্দেশে অন্যত্র আবার দাফন করা হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায় লাশ মোবারক দুটি অক্ষত তো ছিলই সাথে তাঁদের কাফনের কাপড়েরও কিছু হয়নি। এই ইরাকেই হযরত আবু সালেহ কুর্দি (রহ.) নামে মহান আল্লাহর এক প্রিয় বান্দা আছেন যিনি নবীও নন, সাহাবীও নন কিংবা শহীদও নন। কবর থেকে ওনার একটি পবিত্র চরণ এখনও পর্যন্ত বের হয়ে আছে যে চরণের পবিত্র নখ গুলো প্রতি সপ্তাহান্তে কেটে দিতে হয়। জানা যায় কোন এক বেয়াদবকে কবর থেকে লাথি মারার ফলে ওনার পবিত্র চরণ যে বের হয়েছিল সেটি সে অবস্থায়ই আছে। এই একবিংশ শতাব্দীতেও মাঝে মাঝে পত্রিকায় আসে যে বহু বছর কবরে থাকার পরও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের পবিত্র লাশে একটুও পচন ধরেনি। এ ধরনের কোন ঘটনা আপনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অন্যান্য পাড়ায় পাবেন না। হিন্দুরা তো ভয়ে নিজেদের জ্বালিয়ে ফেলে। অথচ ’মু’মিন’ কিংবা ’মুসলিম’ কে আগুনও পোড়াতে পারে না। কারণ বহুপূর্বে আগুনের রব বলেছিলেন,
”হে আগুন, আরাম এবং শান্তিদায়ক হও ইব্রাহিমের উপর” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৬৯)।
সদ্য জন্ম নেয়া একটি নিষ্পাপ শিশু যদি কোন কারণে নাম রাখার পূর্বেই মারা যায় দেখা যাবে তার লাশও এক মাস পর আর কবরে পাওয়া যাবে না। কেন? শিশুটি তো নিষ্পাপ। পৃথিবীর বিন্দুতম পঙ্কিলতা তাকে স্পর্শ করেনি। কোন ধর্মও তার জন্য নির্ধারিত হয়নি। তবু কেন শিশুটি মাটির সাথে মিশে গেল? কারণ একটাই। ’মু’মিন’ কিংবা ’মুসলিম’ হতে না পারলে কারো রক্ষা নেই। কাঁচা ইট আর পাকা ইট, দু’টোই ইট কিন্তু পার্থক্য বিশাল। কাঁচা ইট মাটিতে কয়েকদিন রাখলে ঝড়-বৃষ্টিতে এমনিই সে মাটির সাথে মিশে যাবে। আর যেটি ভাটার আগুনে জ্বলে-পুড়ে নিজের স্বভাবজাত রং পাল্টে অন্য রং (লাল) ধারণ করে সেটিকে মাটির যত গভীরেই প্রোথিত করা হোক না কেন তা কস্মিনকালেও মাটির সাথে মিশবে না। মাটির মানুষ (!) যদি কোন একজন কামেল মুর্শিদের নিকট থেকে দীক্ষা নিয়ে সাধনা আর চরিত্র বলে নিজের ভেতরটাকে ’মু’মিন’ কিংবা ’মুসলিম’ বানিয়ে ফেলতে পারেন তবে তিনিও অমর হয়ে যান। কেউ কেউ হয়ত দাবি করতে পারেন আমি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইসলামি কিংবা অন্য আর যাই কিছু হই না কেন নিজে ঠিক থাকলে তো হল। আবার কামেল মুর্শিদের নিকট যেতে হবে কেন? উত্তর একদম সোজা। যেখানে একটি নিষ্পাপ শিশুও নিজেকে তার নির্দোষিতা দিয়ে মাটির গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পারল না সেখানে আপনার নিশ্চয়তা কী? কাঁচা ইটকে পোড়ানোর জন্য যেভাবে ভাটার আগুনের নিকট যেতে হয় সেভাবে কাঁচা মানুষকে আল্লাহ প্রেমের আগুনে পোড়ার জন্যও কামেল মুর্শিদের নিকট যেতে হবে। আর কামেল মুর্শিদের একমাত্র কাজ ’মু’মিন’ কিংবা ’মুসলিম’ বানানো, মুরিদ (ভক্ত বা শিষ্য) বানানো নয়। যারা ’মুরিদ’ বানায় (যেমন- ’পীর’ বাবা, ’আলেম’ বাবা, ’গুরু’ বাবা, ’লোকনাথ’ বাবা, ’ভান্তে’ বাবা, ’পোপ’ বাবা ইত্যাদি) তাদের নিকট থেকে এক হাজার মাইল দূরে থাকবেন কারণ তারা ’পীর’, ’আলেম’, ’গুরু’, ’লোকনাথ’, ’ভান্তে’, ’পোপ’ নামক উপাধি গায়ের জোরে নিজের স্কন্ধে লাগিয়ে দেদার ব্যবসা করে কোটি কোটি মানুষদের অন্ধকারে রেখে দিচ্ছে। কারণ তারা নিজেরাও তো অন্ধ। এক অন্ধ কি আরেক অন্ধকে পথ দেখাতে পারে? পুস্তকের জ্ঞান দিয়ে হয়ত পৃথিবীতে খেয়ে-পরে চতুষ্পাদ প্রাণীর মত বেঁচে থাকা যায় কিন্তু অন্ধত্ব দূর করা যায় না।

মৃত্যুর আগে মানুষের কত দাপট দেখি কিন্তু মৃত্যুর পর সেই দাপুটের সাথে একটি মাছেরও কোন পার্থক্য থাকে না। উভয়কে পচন থেকে রক্ষার জন্য হিমায়কে (ফ্রিজার) রাখতে হয়! মৃত্যুর পর সেই দাপুটের দাপট আর থাকে না। চট্টগ্রামের হালিশহরের একজন বিশিষ্ট বিত্তশালী ব্যবসায়ীর (নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম) ইচ্ছা হয়েছিল মৃত্যুর পর তার কবর যেন ’মাযারের’ মত করে দেয়া হয়। বাবার অসিয়ত মতে তার সন্তানেরা তাই করল। কিন্তু দু’দিন না যেতেই তার সন্তানেরা বাবার মাযারটি ভেঙ্গে সাধারণ কবর করে দিল। পরে জানা গেল ওই বিশিষ্ট বিত্তশালী ব্যবসায়ী স্বপ্নে তার সন্তানদের নির্দেশ দিলেন দ্রুত যেন ’মাযার’টি ভেঙ্গে ফেলা হয়। মাযার অর্থ ঘর আর ঘরে কোন মৃত মানুষ থাকে না।
কিন্তু যাঁরা ’মু’মিন’ এবং ’মুসলিম’ তাঁদের যেহেতু ”মৃত্যু” নেই তাই তাঁদের দাপট পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পরও থেকে যায়। বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গাজী ভঙ্গি শাহ (রহ.)-এর মাযার আশা করি সবাই চেনেন। চট্টগ্রামের বটতলী ষ্টেশন মসজিদের পাশে সড়কের মধ্যেই তাঁর মাযার। ব্যস্ততম রাস্তার মাঝে যে শুয়েছেন আর উঠার নাম নেই। কারো সাহস নেই তোলার, কি সরকার কি জনগণ। কবরে অথচ কী দাপটের সাথে শুয়ে আছেন। তাঁর স্থানে যদি অন্য কারো কবর হত তবে এতোদিনে হয়ত মাটির সাথে মিশে যেত। পাশেই কিন্তু ’চৈতন্য গলি’ কবরস্থান যেখানে শুয়েছিলেন চট্টগ্রামের ইয়া বড় বড় মানুষেরা যাদের অভাব ছিল না অর্থের, অভাব ছিল না সম্পদের কিন্তু তাদের কবর গুলো খুঁড়ে দেখুন হাড্ডি ব্যতীত আর কিছুই পাওয়া যাবে না। তাদের এত এত অর্থ-সম্পদ তাদেরকে সামান্য মাটির করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে পারেনি।

আর বেশি কিছু বলার দরকার নেই। এবার সিদ্ধান্ত আপনার। আপনি কি ’মু’মিন’ কিংবা ’মুসলিম’ হয়ে অমর হবেন নাকি মাটি আর কীটের আহার্য হবেন?

মানুষ মরণশীল নয়

জন্মিলে মরতে হয়, আমরা সবাই জানি। আর তাই বলা হয় মানুষ মরণশীল। আমাদের চেনা মুরব্বীরা কেউ আজ নেই। মায়ের পেট থেকে মৃত শিশু বের হয়, আবার যেকোন বয়সেই, কি এক বছর আর কি একশ বছর, যে কেউ মারা যাচ্ছে। আসলেই কি মানুষ মারা যায় না অন্য কিছু হয়! মানুষের রূপান্তরকর্তা কোরআনে বলছেন,
”কুল্লু নাফসিন যা-য়িক্বাতুল মাওত” (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৮৫; সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৫; সূরা আনকাবুত, আয়াত: ৫৭)। অর্থ: ”প্রত্যেক নফস মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে”।
অথচ অনেক কোরআন ব্যাখ্যাবিদ আয়াতটির অনুবাদ করেছেন ”প্রত্যেক জীব বা প্রাণীকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে”। কোথায় ’নফস’ আর কোথায় ’জীব বা প্রাণী’! নফস একটি লতিফার নাম, লতিফার বাংলা হল অদৃশ্য ইন্দ্রিয়। লক্ষ্যণীয়, ’মৃত্যুবরণ করা’ আর ’মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করা’ কিন্তু এক জিনিস নয়। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে নফসের মৃত্যু নেই, মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে মাত্র। নইলে বলা হত প্রত্যেক নফস ধ্বংস হয়ে যাবে। নফস পবিত্র কিন্তু যখন এর উপর দুনিয়ার কলুষিত মায়া পতিত হয় অর্থাৎ দুনিয়া এবং এর জাঁক-জমক ও আরাম-আয়েস নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতে মানুষ যখন আখেরাতকে ভুলে শয়তানের খপ্পরে পড়ে তখন নফস হয়ে যায় অপবিত্র। সৎ কর্মের মাধ্যমে যিনি নিজেকে যত পরিশুদ্ধ করতে পারেন তিনি তত উন্নত নফসের অধিকারী হতে পারেন। আর তাই পবিত্র কোরআনে কর্ম বিবেচনায় চার প্রকার নফসের উল্লেখ দেখা যায়।
প্রথমটি হচ্ছে ’নফসে আম্মারা’ (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩ দ্রষ্টব্য) অর্থাৎ যে নফস আত্মশুদ্ধির কোনরূপ চেষ্টা করে না, সাময়িক আনন্দ আর সুখে যে নফস পাপের পর পাপ করে যেতে থাকে, আত্মগরিমার অন্ধকারে যে নফস সম্পূর্ণ কলুষিত। পৃথিবীর ”অধিকাংশ মানুষ” এ নফসের বাহন।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে ’নফসে লাওয়ামা’ (সূরা ক্বিয়ামত, আয়াত: ২ দ্রষ্টব্য) তথা যে নফস আত্মশুদ্ধির জন্য সর্বপ্রকার অন্যায় ও প্রবৃত্তির কুতাড়নার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত আছে। উল্লেখ্য সূরা ক্বিয়ামতের প্রথম আয়াতে ক্বিয়ামত তথা একটি নফসের সৃষ্টির বন্ধন হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়ের কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ মৃত্যু। অনেকে মনে করে ক্বিয়ামত হচ্ছে পৃথিবী এবং আকাশ মহাকাশ ধ্বংস হয়ে যাওয়া! আপনার চলে যাওয়াটাই হচ্ছে ক্বিয়ামত কারণ আপনি আর আসবেন না। পৃথিবী থাকলেও কি আর না থাকলেও কি আপনি তো নেই। আপনি নেই কিছুই নেই। যদিও সবকিছু আছে শুধু আপনার জন্য নেই। যদিও এ মর্ত্যের জগতে আপনার প্রবেশ চিরতরে নিষিদ্ধ কিন্তু রূপান্তর প্রক্রিয়ায় আপনি আবার জীবিত হবেন কারণ নফস শক্তির একটি অংশ আর আমরা সবাই জানি (বিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে) শক্তির ধ্বংস নেই আছে শুধু রূপান্তর আর এজন্যই মহান আল্লাহর আরেক নাম ’খালেক্ব’ অর্থাৎ রূপান্তরকর্তা। আর তাই সূরাটির দ্বিতীয় আয়াতে ’নফসে লাওয়ামা’-এর কথা বলা হয়েছে এজন্য যে লাওয়ামা নফস সৎকর্মের চেষ্টায় রত আছে যাতে সে আরো উচ্চস্তরে যেতে পারে। পৃথিবীর ”কিছু মানুষ” এ নফসের বাহন।
তৃতীয়টি হচ্ছে ’নফসে মোত্বমায়েন্নাহ’ (সূরা ফাজ্বর, আয়াত: ২৭ দ্রষ্টব্য) তথা প্রশান্ত নফস তথা সম্মানিত নফস। একমাত্র এ নফসটিকেই রবের দিকে খুশি মনে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। অন্য আর কাউকে নয়। অনেকে সূরা বাকারার ১৫৬ আয়াতের (ইন্না লিল্লাহে …) দোহাই দিয়ে বলে আমরা সবাই নাকি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করব। মোটেই না। আয়াতটিতে সবার কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে শুধু ধৈর্য্যশীল ঈমানদারদের কথা। শুধুমাত্র তাঁরাই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে (সংখ্যার বিচারে ”মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ”)। বাকীরা কোথায় যাবে দয়া করে বুঝে নিন।
চতুর্থটি হচ্ছে ’নফসে ওয়াহেদ’ (সূরা নেসা, আয়াত: ১, সূরা আনাম, আয়াত: ৯৮, সূরা আরাফ, আয়াত: ১৮৯ দ্রষ্টব্য)। নফসের এ স্তর সর্বোচ্চ মানের স্তর। এ নফস সম্পর্কে আর বেশি কিছু বলার অর্থই হল দুধের শিশুকে পোলাও-কোর্মা গেলানোর সমতুল্য। ’নফসে লাওয়ামা’ পর্যায়ে আসুন তখন আপনি নিজেই বুঝবেন ’নফসে ওয়াহেদ’ কী এবং কারা।
অনেকে আবার মনে করতে পারে নফস মনে হয় চারটি। আসলে নফস একটিই কিন্তু মানুষের কর্ম ভেদে রূপ পরিগ্রহণ করে চারটি। কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আপনি নিজেকে উচ্চ পর্যায়ের জ্ঞানীর স্তরে নিয়ে যেতে পারেন আবার অধ্যবসায় না করে ’এইট পাশ’ পর্যায়েও রাখতে পারেন। হাদীসে কুদসীতে আছে, ’মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু’ অর্থাৎ যে নিজের নফসকে চিনতে পেরেছে সে তার রবকে চিনতে পেরেছে। এজন্যই ’নফসে মোত্বমায়েন্নাহ’ কে রবের দিকে খুশি মনে ফিরে যেতে বলা হয়েছে কারণ সে তার রবকে চিনেছে।
অনুধাবন করার বিষয় হল হাদীসটিতে বলা হয়নি ’যে নিজের ”রূহ”কে চিনতে পেরেছে সে তার রবকে চিনতে পেরেছে’। বলা হয়েছে নফসের কথা। অথচ মানুষ মৃত্যুবরণ করলে অনেকে বলে লোকটির রূহ চলে গেছে! আমার প্রশ্ন – রূহ আসলো কবে যে আবার চলে যাবে। অনেকে আবার রূহের মাগফেরাতও কামনা করেন মুনাজাতে! কোরআনে রূহের জন্ম-মৃত্যু বিষয়ে কিছুই উল্লেখ নেই। শুধু উল্লেখ আছে রূহ নাযিল হয় কিংবা ফুৎকার করা হয় কিংবা অহি হয়। রূহ কী? কোরআনে রূহ সম্পর্কে বেশি কিছু বলা হয়নি, মাত্র সতের বার রূহের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। রূহ রহস্যময়। বলে কিংবা লিখে রূহ সম্পর্কে তেমন কিছু বুঝানো যাবে না। রূহ সৃষ্টির পর্যায়ে পড়ে না বরঞ্চ রূহ সৃজনী শক্তির অধিকারী। রূহ সকল সংজ্ঞার উর্ধ্বে। যিনি রূহের অধিকারী হন সমস্ত সৃষ্টি তখন তাঁর আদেশ মানতে বাধ্য হয়ে যায়। কোরআনে আছে,
”এবং এভাবে আমরা (হে মানব) তোমার প্রতি অহি করেছি রূহ আমাদের নির্দেশে। কিতাব এবং ঈমান কী তা তুমি জানতে না এবং আমরা এটিকে (রূহকে) করেছি একটি নূর যা দ্বারা আমরা পরিচালনা করি আমাদের দাসগণের মধ্যে যে অসীম ইচ্ছা রাখে তাকে” (সূরা শুরা, আয়াত: ৫২)।
আয়াতটি থেকে বুঝা যাচ্ছে রূহ হচ্ছে নূর এবং এ নূরের অধিকারী হলে আপনি বুঝতে পারবেন কিতাব এবং ঈমান কী এবং তখন আপনি আর আগের ”আপনি” থাকবেন না, আপনার সমস্ত কর্মকান্ড পরিচালিত হবে উপরের নির্দেশে, আপনি তখন ”হও” বললে পাথরও সোনায় পরিণত হবে। নূর অর্থ আলো। আলো কিন্তু দেখা যায়। অন্ধকার সৃষ্টি করতে হয় না কিন্তু আলো সৃষ্টি করতে হয়। আর কোন কিছু সৃষ্টি করতে হলে শক্তির প্রয়োজন- সেটা হতে পারে জ্ঞানের শক্তি, শারীরিক শক্তি কিংবা মানসিক শক্তি। চোখ বন্ধ করলে আমরা আর কিছু দেখতে পাই না, সবকিছু অন্ধকার লাগে। খোলা চোখেও আমরা বেশি দূর দেখতে পারি না। যেখানে খোলা চোখে দৃশ্যমান অনেক কিছু দেখা যাচ্ছে না সেখানে অদৃশ্যমান কিছু দেখা তো অসম্ভব ব্যাপার। কোরআনে আছে,
”আল্লাহ চিদাকাশ এবং ভবদেহর নূর” (সূরা নূর, আয়াত: ১)।
রূহের অধিকারী হলেই কেবল বুঝা যাবে আল্লাহ চিদাকাশ এবং দেহভান্ডের নূর কারণ নূরের অধিকারী না হলে মহাশক্তিমান নূরের পরিচয় পাওয়া কখনোই সম্ভব নয়। একজন জ্ঞানী ব্যক্তিই কেবল তাঁর মত অন্য আরেকজন জ্ঞানীর জ্ঞান পরিমাপ করতে পারবেন যা কোন মূর্খের দ্বারা সম্ভব নয়। সমস্ত মানব শিশুই জ্ঞান নিয়ে জন্মগ্রহণ করে কিন্তু সবাই জ্ঞানী হয় না, হয় কেবল তাঁরাই যাঁরা অধ্যবসায় ও জ্ঞান সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখে। ঠিক সবার মাঝে রূহ সুপ্ত ভাবে বিরাজ করলেও সবার উপর রূহ অহি করা হয় না, হয় কেবল তাঁদের উপর যাঁরা সৎকর্মের মাধ্যমে নিজেকে ধ্যান সাধনায় নিয়োজিত রাখেন। যাঁর উপর রূহ অহি হয় তাঁকে হেদায়েতও দান করা হয় এবং যাঁকে হেদায়েত দান করা হয় তাঁর দ্বারা কখনো আর কোন পাপ কর্ম সম্পাদিত হয় না (কি প্রকাশ্যে কি গোপনে)।
আশা করি এ পর্যন্ত আপনারা নফস এবং রূহের পার্থক্যটি বুঝেছেন। এবার আলোকপাত করব আরেকটি লতিফার যার নাম ’কাল্ব’। আমি নফস, রূহ কিংবা কাল্ব কোনটিরই বাংলা অনুবাদ দিইনি কারণ এগুলোর সঠিক বাংলা অনুবাদ বা ভাবানুবাদ কিংবা পরিভাষা হয় না। অনেকে করেছেন এবং তালগোলও পাকিয়ে ফেলেছেন। আমি ওপথে যাচ্ছি না। আমার কাজ পথহারাদের সত্যপথের সন্ধান দেয়া। কাল্ব বিষয়ে পবিত্র কোরআনে সূরা শুআরা, আয়াত: ৮৮-৮৯ এ মহান আল্লাহ বলছেন,
”সেদিন কাজে আসবে না (কোন প্রকার) ধন-সম্পদ কিংবা সন্তান-সন্ততি তবে (উপকারে আসবে) যিনি আল্লাহর নিকট একটি পরিশুদ্ধ কাল্ব নিয়ে উপস্থিত হবেন”।
নফসও বলা হয়নি, রূহও বলা হয়নি। বলা হয়েছে কাল্ব-এর কথা। ধন-সম্পদ অর্থ হল দুনিয়া এবং এর মায়া আর সন্তান-সন্ততি বলতে পরিজনদের বুঝানো হয়েছে। ’সেদিন কাজে আসবে না’, কোন সে দিন? সেদিনটি হল মৃত্যুর দিন। ধন-সম্পদও থাকবে, সন্তান-সন্ততিও থাকবে, থাকবেন না শুধু আপনি। কেউ আপনার মৃত্যুযাত্রা আটকিয়ে রাখতে পারবে না। চলে যেতেই হবে। যেকোন সময়। তবে এমনি এমনি চলে গেলে আপনার ইহকাল তো শেষই পরকালেও আপনি মহাবিপদে পড়ে যাবেন যদি একটি পরিশুদ্ধ কাল্ব নিয়ে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হন। পরিশুদ্ধ কাল্ব কী? কীভাবে কাল্ব বিশুদ্ধ হয়? মহান আল্লাহ বলছেন,
”কোন সন্দেহ নেই আল্লাহর জিকিরের (অর্থাৎ স্মরণ) মধ্যেই কাল্বের প্রশান্তি” (সূরা রা’দ, আয়াত: ২৮)।
আয়াতটিতে মহান আল্লাহ স্পষ্ট এবং খোলাসা করেই বলে দিয়েছেন যে একমাত্র আল্লাহর স্মরণের মধ্যেই কাল্বের শান্তি নিহিত। মহান আল্লাহর স্মরণ তথা জিকির কাল্বে ধারণ করতে হয়। কেউ যদি অন্য কোন কিছুর (ব্যক্তি কিংবা বস্তু) স্মরণে ব্যস্ত থাকে তবে তার কাল্ব কখনো শান্তি পাবে না। মুখের জিকির আর কাল্বের জিকির এক বিষয় নয়। মুখে সবাই আল্লাহ আল্লাহ জপতে পারে কিন্তু কাল্বে দেখা যাবে শয়তানের বসবাস। মুখের জিকির জেগে থাকা পর্যন্ত, ঘুমিয়ে গেলে জিকিরও শেষ কিন্তু কাল্বে যদি জিকির পৌঁছানো যায় তবে কি ঘুমে কি জাগ্রতে কি ব্যস্ততায় কি একাকীত্বে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই জিকির বিরতিহীন চলতেই থাকবে। অনেক গর্দভরা বলে থাকে যে মুখে জিকির করতে করতে একদিন নাকি কাল্বেও জিকির চালু হয়ে যাবে। তারা জানে না কাল্বের এ জিকির মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়। কোরআনে আছে,
”নিশ্চয় আমরা জিকির নাযিল করি এবং নিশ্চয় আমরাই উহার সংরক্ষণকারী” (সূরা হিজর, আয়াত: ৯)।
সবার উপর এ জিকির নাযিল হয় না। যাঁদের উপর এ জিকির নাযিল হয় তাঁদেরকে বলা হয় ’আহলে জিকির’ এবং তাঁদের নিকট থেকেই এ জিকির সংগ্রহ করতে হয়। কোরআনে আছে,
”অতএব জিজ্ঞেস করো আহলে জিকিরদের যদি তোমরা না জানো” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৭)।
আরো উল্লেখ্য যে উপরোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহর জিকিরের মধ্যেই কাল্বের প্রশান্তি, এখানে নফস কিংবা রূহের শান্তির কথা বলা হয়নি। এক হাদীসে উল্লেখ হয়েছে, ”শরীরের ভেতর একটি মাংসপিন্ড আছে, সেটি যদি পবিত্র থাকে তবে পুরো শরীরে শান্তি নচেৎ অশান্তি আর সেই মাংসপিন্ডটি হলো কাল্ব”। নফসের চারটি রূপ আছে কিন্তু কাল্বের কোন রূপ নেই, নেই রূহেরও। আবার কাল্বের বহুবচন আছে কিন্তু পুরো কোরআনে রূহ একবচন।
নফস, রূহ এবং কাল্ব সম্পর্কে আরো অনেক কিছু বলা যেত কিন্তু আমাকে এখানে পর্দা টানতে হচ্ছে কারণ কাঁঠাল যে খায়নি তাকে ইনিয়ে-বিনিয়ে যতই কাঁঠালের মজা বুঝানো হোক না কেন সে বুঝবে না। বুঝাতে হলে তাকে আগে কাঁঠাল খাওয়াতে হবে। সুতরাং নফস, রূহ এবং কাল্ব সম্পর্কে আরো জানতে হলে আরো বুঝতে হলে এবং নিজের শরীরে এসব লতীফার অস্তিত্ব অনুধাবন করতে হলে সর্বপ্রথম আপনাকে যা করতে হবে তা হল ঈমান অর্জন। প্রশ্ন করতে পারেন আমাদের মা-বাবা তো ইসলামের অনুসারী, আমরা তো তাদেরই সন্তান কেন আবার ঈমান অর্জন করতে হবে। যদি আমি পাল্টা প্রশ্ন করি যে ধরা যাক আপনার মা-বাবা উভয়ে চিকিৎসক এখন তাদের ঘরে জন্মগ্রহণ করে আপনিও কি নিজেকে চিকিৎসক দাবি করতে পারবেন? যদি না পারেন তবে ঈমানদারও দাবি করতে পারেন না। বলে রাখা ভাল কলেমা আর ঈমান এক জিনিস নয়। কলেমা তাইয়্যেবা যে কেউ আপনাকে পড়াতে পারবে (এমনকি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানও) কিন্তু ঈমান সবাই দিতে পারবে না। ঈমান অনুভব আর ধারণ করার বিষয় মুখে উচ্চারণের বিষয় নয়।

কোথাও আলো নেই

সূর্য ডুবে গেলে
আমরা আয়োজন করি আলো জ্বালানোর।

একি! বিদ্যুৎ নেই?
কাপ্তাই যে বেদখল হয়ে গেছে তুমি জানো না?
তো গ্যাস, গ্যাস তো আছে …
তুমি কি আসলেই দেশে আছো, গ্যাস তো কবেই শ্যাষ
কেন দেশ না একসময় গ্যাসের উপর ভেসেছিল …
এখন হাওয়ায় ভাসছে
তেলের সন্ধানে বের হয়ে যা শুনলাম-
তোষামোদে নাকি তেল সব শ্যাষ!
কয়লার খোঁজে গিয়ে আমি তো তাজ্জব
কয়লাও চুরি হতে হয়?
চারশো বিশ নম্বর বারুদে দেশ ছেয়ে গেছে
তাই ম্যাচের কাঠিও জ্বলে না

আমাদের সম্মুখে এখন কঠিন অন্ধকার
আমরা কি আবার আদিম যুগে ফিরে যাবো
পাথরে পাথর ঘষে একটু আলোর আশায় …

সুন্নী, ওয়াহাবী, শিয়া, তাবলীগি, জামায়াতী, তালেবানী, আইএসআইএস ইত্যাদি আসলে কী?

”হে ঈমানদারেরা, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া কর, খাঁটি তাকওয়া এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০২)।
ভাল করে আয়াতটি লক্ষ্য করুন, ঈমানদারদের উদ্দেশ্য করে মহান আল্লাহ বলছেন তারা যেন আল্লাহর খাঁটি তাকওয়া করে এবং অবশ্যই যেন মুসলমান হয়ে মৃত্যুবরণ করে। কোরআনে যাবতীয় আদেশ-উপদেশ (যেমন সালাত, সাওম, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি) সবই ঈমানদারদের উদ্দেশ্য করে। সাধারণ মানুষদের প্রতি একটিই নির্দেশ- তারা যেন আগে ’ইনসান’ কিংবা ’ঈমানদার’ হয়। কারণ যতক্ষণ একটি মানুষ ’ইনসান’ কিংবা ’ঈমানদার’ হতে পারছে না ততক্ষণ তার দ্বারা কোরআন কিংবা কোরআনের নির্দেশ মানা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ তার দ্বারা নামায-রোযা কিছুই হবে না। যদিও আমরা দেখি বর্তমানে মসজিদে নামাযী বেড়েছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে অধিকাংশই সুদ কিংবা অন্যান্য অপকর্মে নিজেদের আকণ্ঠ নিমজ্জিত রেখেছে। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে লেখা আছে ’যতদিন ঔষধ সেবন করিবেন ততদিন গরুর গোস্ত, চিংড়ি মাছ খাওয়া নিষেধ।’ এখন আপনি খেতে বসে গরুর গোস্ত, চিংড়ি মাছকে যদি উপেক্ষা করতে না পারেন আপনার রোগ কি ভাল হবে? কোরআনে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়া তো দূরের কথা নামাযের ধারে-কাছে যেতেও নিষেধ করা হয়েছে। এখন আপনি সুদের নেশা, ঘুষের নেশা, নারীর নেশা, টাকার নেশা ইত্যাদি নেশায় আক্রান্ত হয়ে নামাযে দাঁড়ালে কস্মিনকালেও ’ইনসান’ কিংবা ’ঈমানদার’ হতে পারবেন না। আর ’ঈমানদার’ হতে না পারলে ’মুসলমান’ হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। অথচ আমাদের সেই আদ্যিকালের ধারণা (কুসংস্কার) এই যে মুসলমান নামধারীর ঘরে জন্মগ্রহণ করতে পারলেই কেল্লাফতে, আমিও মুসলমান! এসব ফালতু চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে ’সাধারণ মানুষদের’ কোরআন কী বলে সম্বোধন করেছে। কোরআন ’সাধারণ মানুষদের’ বিভিন্ন নামে সম্বোধন করেছে। নামগুলো যদি এক এক করে বলতে যাই আপনারা থমকে যাবেন। হক এবং সত্য কথনে মহান আল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট। এতে কে খুশি হচ্ছে আর কে বেজাড় হচ্ছে তাতে তাঁর বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। নামগুলো ইচ্ছে করেই এ লেখাতে বলছি না। এক একটি নাম নিয়ে এক একটি পর্ব লেখার ইচ্ছে আছে ইনশাআল্লাহ।
কোরআন ’তেলাওয়াত’ (পড়া), অনুবাদ, তাফসীর কিংবা জানার জন্য আসেনি, এসেছে মানার জন্য। আপনি অত্যন্ত শুদ্ধ করে সুমধুর সুরে কোরআন পড়তে পারেন এতে আহামরি হওয়ার কিছু নেই। আরবের লোকেরা আপনার চেয়ে ঢের বিশুদ্ধ করে কোরআন পড়তে পারে অথচ তাঁরা বন্ধু হিসেবে বেছে নিয়েছে খ্রিস্টান আর ইহুদীদেরকে যা কোরআনের চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। আপনি খুব কোরআন জানেন, অনুবাদ কিংবা তাফসীর করে বাজারে ছেড়ে দিয়েছেন এতেও আহামরি হওয়ার মতো কিছু নেই। গিরিশ চন্দ্র সেনও কোরআন অনুবাদ করেছেন কিন্তু মানতে পারেননি বলেই ’যে লাউ সে কদুই’ রয়ে গেলেন। আর আমরা সেই একটি মাত্র কোরআন পড়ে ভাগ হয়ে গেলাম সুন্নী, ওয়াহাবী, শিয়া, তাবলীগি, জামায়াতী, তালেবানী, আইএসআইএস ইত্যাদি মধুর মধুর নামে!
উপরোক্ত আয়াতটির প্রতি আবার আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বলা হয়েছে, মুসলমান হয়েই আমরা যেন মৃত্যুবরণ করি। বলা হয়নি সুন্নী, ওয়াহাবী, শিয়া, তাবলীগি, জামায়াতী, তালেবানী, আইএসআইএস ইত্যাদি হয়ে মৃত্যুবরণ করতে। আমরা এখন ধর্ম হিসেবে লিখি ’ইসলাম’ আর বর্ণ হিসেবে কেউ লেখে সুন্নী, কেউ শিয়া কেউ অমুক কেউ তমুক। কিন্তু কেন? ’ইসলাম’-এ তো কোন বর্ণপ্রথা নেই, কখনো ছিল না। তাহলে এগুলো কোত্থেকে এলো? কারা, কেন সৃষ্টি করল?
মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নতের উপর আমলকারীকেই সুন্নী বলা হয়। নবীর সুন্নত মানে নবী যা করেছেন তা যথাসাধ্য চেষ্টা করে অনুসরণ করা। কেন নবীকে অনুসরণ করব? সুন্নতের ছোওয়াব অর্জনের জন্য? মোটেই না। একমাত্র আল্লাহকে পাওয়ার জন্য। কারণ নবী ব্যতীরেকে আল্লাহকে খুঁজতে যাওয়া বোকামি বৈ আর কিছু নয়। ’আল্লাহ’ বলে যে একজন সত্তা আছেন তা আমরা জেনেছি নবীদের নিকট থেকে। আর তাই আল্লাহকে পেতে গেলে আমাদের সবাইকে সুন্নী হতে হবে। এখন কেউ যদি সুন্নীর দোহাই দিয়ে দল বানিয়ে নিজেদের ’আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’-এর একমাত্র প্রতিনিধি দাবী করে রাতদিন ওয়াহাবীদের গালি দিয়ে, নবী নূর না মাটি বিষয়ে তর্ক করে গলা ফাটিয়ে পকেট ভারী করার জন্য নিজের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায় তারা কীভাবে সুন্নী হতে পারে? একজন সুন্নীর কাজ হল ঈমান অর্জন করার পর কীভাবে মুসলমান হওয়া যায় সেই চেষ্টায় নিরন্তর সচেষ্ট থাকা। যারা নবীকে নবীর মর্যাদা দেয় না, কোরআনের অপব্যাখ্যা করে নবীকে আমার-তোমার মত মানুষ বানিয়ে দেয় তারা তো ইসলাম থেকে বিছিন্ন। তাদেরকে ওয়াহাবী, সালাফি, আহলে হাদীস, লা-মাযহাবী বলে দলে রাখার দরকার কী? মাতামাতি করারই বা কী দরকার? আগে নিজে নবী সম্পর্কিত বাস্তব জ্ঞান অর্জন করুন। তারপর তাদের সামনে তুলে ধরুন। মানলে ভাল না মানলে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিন। তাদের জ্ঞান কোন পর্যায়ের একটি উদাহরণ দিলে আশা করি বুঝতে পারবেন। ’কাদিয়ানী’ নামক এক নতুন মালের যখন এদেশে আগমন হল তখন তারা ঢাকার রাজপথে গলা ফাটিয়ে সমস্বরে আওয়াজ তুলল ”কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হোক”। আমার প্রশ্ন হল কাদিয়ানীরা মুসলিম ছিল কবে যে তাদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে? নিজেরই ঠিক নেই যে ’মুসলমান’ হতে পেরেছে কিনা আবার আসে আরেকজনকে অমুসলিম ঘোষণা করতে! গাধাও হাসবে!
সম্মানিত সাহাবাদেরকে আল্লাহর নবী আকাশের তারকার সাথে তুলনা করে বলেছেন তাঁদের যে কাউকেও অনুসরণ করবে হেদায়েত পাবে। অথচ কেউ কেউ (শিয়া অনুসারী) হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) ছাড়া প্রধান তিনজন সাহাবাকে (হযরত আবু বকর, হযরত উমর এবং হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) গুরুত্বই দেয় না! বাকীদের কথা না-ই বা বললাম। কী সাংঘাতিক! দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি আধ্যাত্মিক সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমার প্রিয় ইরান নামক একটি দেশে এ মতবাদটির অনুসারীরা সংখ্যাগুরু যে দেশটি নিজেকে পরিচয় দেয় ’ইসলামী প্রজাতন্ত্রী ইরান’ বলে অথচ ইসলামের মূলেই তারা কুঠারাঘাত করেছে! সাহাবারা নিজের জান-মাল দিয়ে নবীকে ভালবেসেছেন আমৃত্যু আর আমরা তাঁদের এ ত্যাগকে অনুসরণ না করে নেমে গেলাম বিভেদ তৈরীর কাজে। এ কথা সত্য যে অধ্যাত্মজ্ঞান জগতে হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর গুরুত্ব অদ্বিতীয় কারণ মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ”আমি হলাম জ্ঞানের শহর আর আলী (হযরত আলী রা.) হল সেই (জ্ঞানের) শহরের প্রবেশদ্বার”। কোন জ্ঞান? যে জ্ঞান দ্বারা মহান আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছা যায়। আমি আগেই বলেছি আল্লাহকে পেতে হলে আগে নবীকে পেতে হবে আর নবীকে পেতে হলে আলীকে লাগবেই। ”নাহজুল বালাঘা” নামক একটি গ্রন্থকে তারা খুব শ্রদ্ধা করে কারণ তাদের বিশ্বাস গ্রন্থটি হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর বক্তৃতা, পত্র আর উক্তির সংকলন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল যিনি অধ্যাত্মজগতের চরম স্তরে বিরাজ করছেন তাঁর গ্রন্থ বলে চালানো বইটিতে অধ্যাত্মজ্ঞান সম্পর্কিত একটিও বক্তৃতা, পত্র আর উক্তি নেই! ’মুতা বিবাহ’ নামক একটি জঘন্য প্রথা সেই কবে ইসলামে নিষিদ্ধ হয়েছে অথচ শিয়ারা আজো এ ’মুতা বিবাহ’ তাদের জন্য জায়েজ করে রেখেছে! বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তারাও ’ইসলাম’কে ওয়াহাবী, সালাফি, আহলে হাদীস, লা-মাযহাবীদের মতো কিছু প্রথা আর গ্রন্থে আবদ্ধ করে ফেলেছে। যেখানে বাস্তবতা নেই সেখানে কখনো সত্য অবস্থান করতে পারে না।
কয়েকটি বই আর ’বহুত ফায়দা’, ’বহুত ছোওয়াব’, ’কোন কোন আমল করলে বেহেশত নিশ্চিত’ এসব টোপ ফেলে আমাদের মাঝে বহু পূর্ব হতে একটি দল তাদের মনগড়া মতবাদ প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যার নাম ’তাবলীগ জামাত’। এবং তারা বলতে গেলে সফল নইলে ’বিশ্ব ইজতিমা’ নামক ছোওয়াবের মরিচিকাময় খনিতে কেন এভাবে দলে দলে লোক গিয়ে কষ্ট করে! শুনেছি প্রতিবছর ’বিশ্ব ইজতিমায়’ লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম হয়। আমার প্রশ্ন যদি কমপক্ষে এক লাখ করে মানুষ প্রতি বছর হেদায়েত হত তবে তো বাংলাদেশ ইসলামিক রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ার কথা। সমস্যা হল ইজতিমায় যারা বয়ান করেন তারা হলেন তাবলীগি বইয়ের পণ্ডিত আর যারা যান তারা দেখেন, শুনেন, মুনাজাত করেন তারপর চলে আসেন এবং স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন যে আমি তো বেহেশতের পথে আছি! একবার তাবলীগ জামাতের এক আমীর (স্থান, কাল, পাত্র গোপন রাখা হল কারণ ব্যক্তি আক্রমণ আমার উদ্দেশ্য নয়) আমাকে দাওয়াত দিলেন আছরের নামাযের পর বসার জন্য। আমি বসার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিলেন ঈমান বিষয়ে বয়ান হবে। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম যে, ঈমান কী। তিনি পুস্তকের কথা ধার করে ইনিয়ে বিনিয়ে যা বললেন তার সার সংক্ষেপ হল ঈমান মানে বিশ্বাস স্থাপন আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে তিনি কত বছর তাবলীগে আছেন। বললেন প্রায় নাকি পাঁচ বছর হবে। এবার আমি তাকে বললাম, পাঁচ বছর তো অনেক সময়। এ সময়ের মধ্যে আপনার তো বুঝার কথা যে ঈমান মানে হল শক্তি, ঈমানের ওজন আছে এবং মানবদেহে যখন ঈমান প্রবেশ করে তা জায়গাও দখল করে। আপনি যে ঈমানদার অর্থাৎ ঈমানওয়ালা এর কোন প্রমাণ কি আপনি পেয়েছেন নিজের মধ্যে? তিনি আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন যে আমি কীসের ভিত্তিতে এসব কথা বলছি। আমি তার উত্তর না দিয়ে আমার করা প্রশ্নের উত্তরটি চাইলে তিনি কথা না বাড়িয়ে বিনয়ের সাথে আমাকে সালাম দিয়ে পরে কথা হবে বলে সরে গেলেন!
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী যিনি ’মাওলানা মওদুদী’ নামেও পরিচিত, ছিলেন একজন গবেষক, লেখক, গ্রন্থকার, কোরআন অনুবাদক ও তাফসীরকারক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও বিংশ শতাব্দীর একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। তিনি তাঁর নিজ দেশ পাকিস্তানের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও ছিলেন। তিনি ’জামায়াতে ইসলামী’ নামক একটি রাজনৈতিক দলেরও প্রতিষ্ঠাতা যে দলটির প্রভাব আমাদের দেশেও কোন অংশে কম না। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী পণ্ডিতদের মধ্যে একজন। যেকোন গবেষকের প্রতি আমার আজীবন শ্রদ্ধার কথা আমি আগেও বলেছি কারণ জ্ঞানের পৃথিবীতে যদি কোন মৌলিক ও কঠিন কর্ম থেকে থাকে তা হল গবেষণা করা। সে হিসেবে গবেষক সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তাঁর দর্শনের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করছি। কারণ তিনি ইসলামের মূলধারা থেকে বের হয়ে একটি বৈপ্লবিক ধারার প্রবর্তন করেছেন যেখানে নৈতিকতা এবং সুমহান আদর্শের কিছুই নেই। মাওলানা মওদুদীর জনপ্রিয়তা যেমন ছিল তেমনি সমালোচনাও কম ছিল না। সমস্যা হল সমালোচনাকারী এবং যার সমালোচনা করা হয়েছে উভয়েই সত্যের ধারেকাছেও নেই। যুগে যুগে ইসলাম এসেছে প্রত্যেক মানব মনে সত্য, ন্যায় এবং নৈতিকতার বিপ্লব ঘটাতে। ইসলামের নামে দল বানিয়ে মানবে মানবে দেশে দেশে বিভেদ তৈরীর জন্য ইসলাম আসেনি। ইতিহাস অনেক বিকৃত তথ্য দিতে পারে তবে জেনে রাখা উচিত আল্লাহর নবী এবং মহান সাহাবারা কখনো গায়ের জোরে ইসলাম প্রচার করেননি এবং আগ বাড়িয়ে কোন যুদ্ধও বাধাননি তবে অন্যায়ের প্রতিরোধ করেছেন। কোরআন মতে সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ভার মু’মীনগণের উপরই ন্যস্ত করা উচিত। মু’মীন কারা? মু’মীন তিনি যিনি নবীকে নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন, যিনি নবীর গুণে গুণান্বিত এবং যিনি মহান আল্লাহর জ্ঞানে জ্ঞানী। যাঁর মধ্যে এ তিনটি গুণ থাকবে তাঁকে পৃথিবীর তাবৎ সৃষ্টি ভয় করবে। এ কারণেই হযরত উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর শাসনামলে মুসলমানরা বিনা রক্তপাতে জেরুজালেম জয় করেছিল। আর বর্তমানে আমরা অস্থায়ী ’গদির’ জন্য চতুষ্পাদ প্রাণীদের মত হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছি! ’জামায়াতে ইসলামী’ দলের প্রতি (ইসলামের প্রতি নয়) নিবেদিত প্রাণ কর্মী ছাড়া এ পর্যন্ত একজন মু’মীন আমাদের উপহার দিতে পারেনি। ’তাফহীমুল কুরআন’ মাওলানা মওদুদীর বিখ্যাত একটি কোরআন তাফসীর গ্রন্থ তবে আমার কাছে বাজারের আর দশটা তাফসীরকারকদের অন্ধের হস্তী দর্শন মার্কা কোরআন তাফসীর বলেই মনে হয়েছে। উদাহরণ না দিলে আবার আমার সমালোচনা হতে পারে তাই দুটি আয়াতের উল্লেখ করব। মাওলানা মওদুদী সূরা ফাতিহার ২য় আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে-
অনুবাদ: ”যিনি পরম দয়ালু ও করুণাময়”
ব্যাখ্যা: ”মানুষের দৃষ্টিতে কোন জিনিস খুব বেশী বলে প্রতীয়মান হলে সেজন্য সে এমন শব্দ ব্যবহার করে যার মাধ্যমে আধিক্যের প্রকাশ ঘটে। আর একটি আধিক্যবোধক শব্দ বলার পর যখন সে অনুভব করে যে ঐ শব্দটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জিনিসটির আধিক্যের প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি তখন সে সেই একই অর্থে আর একটি শব্দ ব্যবহার করে। এভাবে শব্দটির অন্তর্নিহিত গুণের আধিক্য প্রকাশের ব্যাপারে যে কমতি রয়েছে বলে সে মনে করছে তা পূরণ করে। আল্লাহর প্রশংসায় ’রহমান’ শব্দের পরে আবার ’রহীম’ বলার মধ্যেও এই একই নিগূঢ় তত্ত্ব নিহিত রয়েছে। আরবী ভাষায় ’রহমান’ একটি বিপুল আধিক্যবোধক শব্দ। কিন্তু সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর রহমত ও মেহেরবানী এত বেশী ও ব্যাপক এবং এত সীমাসংখ্যাহীন যে, তা বয়ান করার জন্য সবচেয়ে বেশী ও বড় আধিক্যবোধক শব্দ ব্যবহার করার পরও মন ভরে না। তাই তার আধিক্য প্রকাশের হক আদায় করার জন্য আবার ’রহীম’ শব্দটিও বলা হয়েছে। এর দৃষ্টান্ত এভাবে দেয়া যেতে পারে, যেমন আমরা কোন ব্যক্তির দানশীলতার গুণ বর্ণনা করার জন্য ’দাতা’ বলার পরও যখন অতৃপ্তি অনুভব করি তখন এর সাথে ’দানবীর’ শব্দটিও লাগিয়ে দেই। রঙের প্রশংসায় ’সাদা’ শব্দটি বলার পর আবার ’দুধের মতো সাদা’ বলে থাকি।” [তাফহীমুল কুরআন]

এবার বিশ্লেষণে আসি। বস্তুত ’রহমান’ এবং ’রহীম’ মহান আল্লাহর দুটি গুণবাচক নাম তাই এ পবিত্র নাম দুটোর অনুবাদে পরম দয়ালু কিংবা করুণাময় কিংবা অন্য আরো কিছু উল্লেখ না করে ’আর রহমান’ এবং ’আর রহীম’ উল্লেখ করাই শ্রেয়। কেন শ্রেয় এর কারণ জানতে হলে আমাদেরকে আরো গভীরে যেতে হবে। জানতে হবে ’রহমান’ কী এবং ’রহীম’ কী। ’রহমান’ তিনি যিনি,
”আর রহমান। শিক্ষা দেন আল কোরআন। রূপান্তর করেন ইনসান। শিক্ষা দেন বয়ান।” (সূরা আর রহমান, আয়াত: ১-৪)
’রহীম’ তিনি যিনি,
”এটি শক্তিশালী রহীম হতে নাযেল।” (সূরা ইয়া-সিন, আয়াত: ৫)
পাঠক গভীরভাবে লক্ষ্য করুন, ’রহমান’ কোরআন শিক্ষা দেন আবার বয়ানও শিক্ষা দেন আর ’রহীম’ কোরআন নাযিল করেন। কোরআন শিক্ষা আর কোরআন নাযিল এক বিষয় নয়। কোরআন শিক্ষা দেয়া সহজ কিন্তু কোরআন নাযিল অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। আর তাই ’রহীমের’ আগে ’শক্তিশালী’ বিশেষণ আছে যা রহমানের আগে নেই। আরো অনেক গুপ্তভেদ আছে যা সাধারণ্যে প্রকাশযোগ্য নয়।
সূরা মুহাম্মদ-এর ১৯নং আয়াত মাওলানা মওদুদী অনুবাদ করেছেন এভাবে-
”অতএব, হে নবী! ভাল করে জেনে নাও, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ইবাদাতের যোগ্য নয়। নিজের ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।”
আপনি যদি আরবী না জানেন তবে কোন আরবী জানা লোকের সাহায্য নিয়ে আয়াতটি একবার আরবীতে পড়ে দেখুন, দেখবেন আয়াতটির শুরু কিংবা শেষ কোথাও নবী বা রসূল শব্দটি নেই। নবীর উপর কোরআন নাযিল হয়েছিল আমাদের হেদায়েতের জন্য, নবীর হেদায়েতের জন্য নয়। আয়াতটিতে আমাদেরকেই বলা হচ্ছে যে, নেই কোন ইলাহ আল্লাহ ব্যতীত এবং নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাও। যিনি জেনে শুনেই পৃথিবীতে প্রচার করতে আসলেন যে, ’আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই’ তাঁকেই কিনা আবার বলা হচ্ছে যে, ’ভাল করে জেনে নাও, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ইবাদাতের যোগ্য নয়’! আরো উদাহরণ দেয়া যেত পাছে আবার ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যায়! অনুবাদের যদি এই হাল হয় তো তাঁর বাকি কর্মের কী হাল হবে তা সহজেই অনুমেয়। শুনেছি তাঁর গায়েবানা জানাজার নামায পবিত্র কাবাতে পড়া হয়েছিল। পবিত্র কাবা আরবে অবস্থিত আর আরবের লোকদের বর্তমান অবস্থা আগেই উল্লেখ করেছি। এবার বুঝে নিন মাওলানা মওদুদী আসলে কোন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও ’ইসলাম’ নামটিকে পুঁজি করে আরো অনেক দল এদেশে আছে তাদের মধ্যে কেউ নেমেছে ইসলামকে হেফাজত করতে (কোরআন বলেছে ইসলামে প্রবেশ করে নিজেকে হেফাজত করতে), কেউ নেমেছে ইসলামি শাসনতন্ত্র কায়েম করতে, কেউ নেমেছে খেলাফত কায়েম করতে ইত্যাদি। সবাই আছে ইসলাম বাঁচানো আর ইসলাম কায়েমের তালে কিন্তু নিজেকে যে আগে বাঁচাতে হবে যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি, নষ্টামি আর লোভ-লালসা হতে এ শিক্ষা কারো মাঝে নেই। থাকলে তারা নিজেদের মাঝে হানাহানিতে লিপ্ত হতো না, লিপ্ত হতো না সামান্য গদির লোভে নারীর আঁচলের নীচে নিজেদের সঁপে দিতে।

সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর যুগে মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য খ্রিস্টানরা তাদের নিজেদের দলের লোকদের আরবী শিক্ষায় শিক্ষিত করে মুসলমানদের মসজিদে ইমাম হিসেবে পাঠাত। চিন্তা করুন, মসজিদের ইমামতি করছে অথচ আদতে খ্রিস্টান। এবার দৃষ্টি দিন বর্তমানকার তালেবান, আল কায়েদা কিংবা আইএসআইএসদের দিকে। মনে হবে যেন ইসলাম কায়েম করে ফেলছে অথচ আদতে ইহুদী-খ্রিস্টানদের পোষ্যপুত্র। অমুক মসজিদের ইমাম, বিখ্যাত আলেমেদ্বীন, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসিরে কোরআন ইত্যকার বিশেষণ শুনে এত উৎসাহিত হওয়ার কিছু নেই। আগে যাচাই করে দেখুন আদতে তারা কোন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছে।

ইসলাম পূর্ব যুগে ’আবু জেহেল’ (অর্থ মূর্খের বাবা)-এর নাম ছিল ’আবু হাকাম’ অর্থাৎ জ্ঞানের বাবা (তার আসল নাম আমর ইবনে হিশাম)। ইসলামের নবী সত্য প্রচারে নেমে সত্যটিকে অর্থাৎ ঈমান ও ইসলামের বাস্তবতা প্রমাণ সহকারে দেখিয়ে দিলেন তখন কথিত ’জ্ঞানের বাবার’ জ্ঞান যখন ধরা খেয়ে তার এতদিনের ’আবু হাকাম’ গদি যায় যায় অবস্থা ওই সময় থেকেই ’আবু হাকাম’ ইসলাম বিরোধীতায় নেমে গেল সত্য জানার পরও। মনে রাখা উচিত জ্ঞান সত্যের অনুগামী, সত্য যেখানে জ্ঞানও সেখানে। ’জ্ঞানের বাবা’ সত্যের বিরোধীতা করলে তাকে তো তখন মূর্খের বাবা নামেই ডাকতে হয়। কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য একটাই আর তা হল বিজ্ঞান যেরূপ প্রমাণে বিশ্বাসী তদ্রুপ ’ইসলাম’ও। যারা ’ইসলামকে’ আউল-ফাউলদের মত কতগুলো অন্ধবিশ্বাসের যপতপ মার্কা সৈনিকদের মত পাঁচ ওয়াক্ত লেফট-রাইট ধর্ম বলে প্রচার করতে চায় এখনো সময় আছে তাদের উচিত নিজেকে শোধরিয়ে আগে ঈমান অর্জন করা।

 

প্রসঙ্গ: খাজা বাবা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর ওরশ

গ্রামের বাড়ি থেকে আমার এক আত্মীয় আমাকে মুঠোআলাপনীতে জানাল যে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও বাড়িতে সামাজিক ভাবে খাজা বাবা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর ওরশ পালিত হবে (এবং আমি যেন সহযোগিতা করি)। খুব ভাল। খাজা বাবা (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর মত মহান বুযুর্গ এবং ওলি আল্লাহর ওরশ পালিত হবে এতে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু আমার প্রশ্ন কেন খাজা বাবার ওরশ পালন করতে হবে? উনি কি কবরে ঠেকে গেছেন যে ওরশ পালন করে ওনার জন্য ছোওয়াব পৌঁছাতে হবে! ওনার কবরে কি প্রচন্ড আজাব হচ্ছে যে ওরশ পালন করে সেটা বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে! অথবা অন্য কোন কারণ?

ইতিহাস সাক্ষী যেদিন খাজা বাবা (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ইন্তিকাল করেন সেদিন ওনার ললাট মোবারকে আরবী হরফে একটি বাক্য পরিস্ফুট হয়েছিল যার বাংলা হচ্ছে ”আল্লাহর বন্ধু আল্লাহর প্রেমে ইন্তেকাল করেছেন”। এ রকম একটি মহান সনদ যাঁর আছে তাঁর জন্য ওরশের কোন প্রয়োজন আছে? কেউ যদি তাঁর মাজারে না যায় এতেও খাজা বাবার কিছু যায় আসবে না। বরঞ্চ ওনার মত ওলি আল্লাহকে আমাদেরই প্রয়োজন।

কেন প্রয়োজন? বছর বছর ওরশের নামে চাঁদাবাজি করার জন্য? ওরশের নামে কাওয়ালী গেয়ে নারী-পুরুষের নাচানাচির জন্য? ওরশের নামে প্রতিবছর পিকনিকের মত ভুরিভোজের জন্য? ছি! আপনাদের লজ্জা করে না? খাজা বাবা (রহমতুল্লাহি আলাইহি) কি এসবের জন্য এসেছিলেন? কঠোর সাধনা আর শ্রমে তিনি আমাদের জন্য ইহলৌকিক আর পরলৌকিক মুক্তি কামনায় একটি ত্বরীকার উদ্ভব করেছিলেন যা ’চিশতীয়া ত্বরীকা’ নামে পরিচিত। যারা ওরশের জন্য পাগলপারা তাদের ’চিশতীয়া ত্বরীকা’ কী প্রশ্ন করলে দেখবেন আকাশ থেকে পড়বে। ’চিশতীয়া ত্বরীকা’র সাধনা আর রেয়াজত করা দূরে থাক এরা অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় নামাযের ধারে-কাছেও নেই অথচ ওরশের জন্য দেওয়ানা! ধিক! এসব ভন্ডদের। ধিক! এদের ভন্ডামির প্রতি। মহান আল্লাহর কাছে এদের হেদায়েত কামনা করছি।

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম এবং সকল মানবজাতির প্রতি – শেষ পর্ব

ধারাবাহিকটির গত (৪র্থ) পর্বের শেষাংশে বলা হয়েছিল- আগুন থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে ’মানুষ’ পদবী থেকে উন্নীত হয়ে ’ঈমানদার’ হতে হবে। আর ঈমানের অধিকারী হতে হলে তাঁদের কাছেই আপনাকে যেতে হবে যাঁদের সাথে আছে মহান আল্লাহর নিগূড় সম্পর্ক। প্রশ্ন হল তাঁরা কাঁরা? আবার তাঁদের সাথে যে মহান আল্লাহর নিগূড় সম্পর্ক আছে সেটি আমরা কীভাবে বুঝবো? কেউ একজন আপনার সামনে এসে দাবি করে বসল আমি আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ, আল্লাহকে ভয় কর আর আমাকে মান্য কর। আপনি কী করবেন? অথবা কেউ একজন আপনার সামনে এসে দাবি করে বসল আমি ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ, ঈশ্বরকে ভয় কর আর আমাকে মান্য কর। আপনি কী করবেন? অথবা কেউ একজন আপনার সামনে এসে দাবি করে বসল আমি আল্লাহর আওলিয়া (’আওলিয়া’ আরবী শব্দ, এর অর্থ হল বন্ধু), আল্লাহকে ভয় কর আর আমাকে মান্য কর। আপনি কী করবেন? আরেকটু আগে যাই। সৃষ্টিকর্তা কি নিজে এসে পৃথিবীতে তাঁর পরিচয় দিয়েছেন না কারো মাধ্যমে তিনি পরিচিত হয়েছেন? উত্তর অবশ্যই দ্বিতীয়টি, তিনি কারো না কারো মাধ্যমে পরিচিত হয়েছেন। যাঁদের মাধ্যমে পরিচিত হয়েছেন তাঁদের আমরা বলি প্রেরিত পুরুষ। তাহলে অবশ্যই ধরে নিতে হবে প্রেরিত পুরুষের সাথে সৃষ্টিকর্তার যোগসূত্র আছে এবং সৃষ্টিকর্তা তাঁর প্রদত্ত ক্ষমতা ও শক্তি দিয়েই প্রেরিত পুরুষ পাঠান। কোরআনে আমরা দেখি, ফেরাউনের যাদুকরেরা যখন তাদের হাতে থাকা দড়ি ও লাঠি গুলোকে সাপ বানিয়ে ছেড়ে দিল তখন হযরত মুসা (আ.) তাঁর হাতে থাকা লাঠিকে ইশারা করা মাত্রই সেটি যাদুকরদের সাপগুলোকে নিমিষেই গিলে ফেলল, হযরত সোলাইমান (আ.) তাঁর সভাসদ পরিবেষ্টিত সিংহাসনটিকে নিয়ে বাতাসের শক্তির সাহায্যে উড়োজাহাজের মতো উড়তেন, হাদীসে আছে- মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে একবার ঘুমন্ত অবস্থায় একা পেয়ে এক কাফের তলোয়ার উচিঁয়ে যখন বলল এবার বাঁচাবে কে, তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম সাথে সাথে বললেন আল্লাহ আর বলা মাত্রই কাফেরটি ভয়ে কাঁপতে শুরু করল এবং তলোয়ারটি তার হাত থেকে পড়ে গেল, আরো জানি, অত্যাচারী হিন্দু রাজাকে শায়েস্তা করার জন্য হযরত খাজা বাবা (রহ.) পুরো আনা সাগরের (ভারতে) পানি নিজের ছোট্ট ঘটিতে ভরে ফেলা ইত্যাদি। তাই সৃষ্টিকর্তার পরিচয় পেতে হলে আপনাকে আগে খুঁজতে হবে তাঁর প্রেরিত পুরুষকে। এবং যিনি প্রেরিত পুরুষ তিনি অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক শক্তির অধিকারী যাকে বলা হয় আধ্যাত্মিক শক্তি। সুতরাং কাউকে গুরু কিংবা বাবা কিংবা ইমাম ডাকার আগে পরীক্ষা করে নিন আসলেই তার নিকট আধ্যাত্মিক শক্তি আছে কিনা। আবার এক্ষেত্রে অনেক অসাধু ধান্ধার জন্য অপশক্তির (যেমন-জ্বিন, কুফুরী কালাম) আশ্রয় নিয়ে অনেক প্রকার ভেল্কিবাজি দেখিয়ে আপনাকে বিভ্রান্ত করতে পারে (যেমন- পীরবাবা, হুজুর বাবা, গায়েবী বাবা, তান্ত্রিক, যোগী ইত্যাদি পদবী লাগিয়ে কিছু ভন্ড মানুষের চেয়ে অধস্তন সৃষ্টি যেমন- জ্বীন ইত্যাদির সাহায্য নিয়ে বুজরুকি কান্ড দেখিয়ে মানুষদের নিজের দলে ভেড়ানো)। মোটেও চমকাবেন না। কারণ যিনি আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী তিনি আপনার মাঝেও আধ্যাত্মিক শক্তির সমাহার ঘটাতে সক্ষম যার বলে আপনি নিজের মধ্যেও ঐশী শক্তি অনুভব করবেন। এবং ধীরে ধীরে আপনার মাঝে প্রকাশ পাবে সৃষ্টিকর্তার পরিচয়। এবং আরো গভীরে গেলে আপনি দেখবেন সবকিছু আসলে আপনাকেই কেন্দ্র করে, আপনি নেই কিছুই নেই! আর এ ব্যবস্থা ’ইসলাম’ ব্যতীত অন্য কোন কিছুতে নেই। শ্রীকৃষ্ণ, গৌতম বুদ্ধ, হযরত ঈসা-মুসা হতে শুরু করে যত নবী-রসূল তথা সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত পুরুষ এ পৃথিবীতে এসেছেন সবাই একটি ধর্মই প্রচার করেছেন আর তা হল ’ইসলাম’। বৈশ্বিক কিংবা পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে তাঁদের ধর্মীয় প্রয়োগবিধি হয়ত ভিন্ন হতে পারে কিন্তু মূলে আসলে একটিই বিশ্বাস আর তা হল ’ইসলাম’। আর ’ইসলাম’ অর্থই হল আত্মসমর্পণ বা সমর্পিত হওয়া। কার কাছে আত্মসমর্পণ? অবশ্যই মহান সৃষ্টিকর্তার সমীপে। এখন সৃষ্টিকর্তা তো নিজে এসে পৃথিবীতে তাঁর পরিচয় দেননি। আন্দাজে কাউকে আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বর, গড আমি কেন ডাকব কোন প্রমাণ ব্যতীত? যেহেতু সৃষ্টিকর্তা নিজেই বলেছেন তিনি তাঁর পরিচয় অবগত করানোর জন্য তাঁর প্রেরিত পুরুষ পাঠিয়েছিলেন, পাঠাচ্ছেন এবং পাঠাবেন অতএব আমাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত পুরুষ-এর নিকটেই। কোরআনে আছে,
”যে রসূলের আনুগত্য করে তবে নিশ্চয় সে আল্লাহরই আনুগত্য করে” (সূরা নেসা, আয়াত: ৮০)।
এছাড়া দ্বিতীয় আর কোন পথ নেই। যে বলবে আছে সে ’শয়তান’ ব্যতীত অন্য কিছু নয়। কারণ আদিতেই এ শয়তান সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত পুরুষ ’আদম’ কে মেনে নেয়নি। এখন অনেকে হয়ত বলতে পারেন বর্তমানে ’রসূল’ নেই তো আমরা কার কাছে সমর্পিত হব। প্রশ্নটি অজ্ঞতাপ্রসূত। রসূল সর্বযুগে আছেন। তিনি ছিলেন, তিনি আছেন এবং তিনি থাকবেন। তবে ভিন্ন নামে। অতীতে নবী, আদম, রসূল আর বর্তমানে মুর্শিদ, মুহসীন, মু’মীন, সালেহীন, মুত্তাকী, ওলিআল্লাহ ইত্যাদি নামে (কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী)।
এখন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইহুদী ধর্মের অনুসারীরা হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন তবে কি শ্রীকৃষ্ণ, গৌতম বুদ্ধ, হযরত ঈসা-মুসা সবাই কি ’ইসলাম’ ধর্মই প্রচার করেছেন? অনেকে হয়ত আহত হতে পারেন কিন্তু উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ, তাঁরা ’ইসলাম’ ধর্মই প্রচার করেছেন। সৃষ্টিকর্তা একজনই সুতরাং ধর্মও একটিই। আপনার বিক্রি হয়ে যাওয়া বিবেক হয়ত বিষয়টি মানতে পারবে না আর আমি কাউকে মানতে বাধ্যও করছি না, আমি শুধু সত্যটিই বলে যাচ্ছি। আবার প্রশ্ন আসতে পারে সৃষ্টিকর্তা একজনই সুতরাং ধর্মও একটি হলে তবে পৃথিবীতে আমরা এতগুলো ধর্ম দেখতে পাচ্ছি কেন? উত্তর সোজা, একটি ছাড়া বাকি সবগুলোই মানবরচিত অথবা স্বার্থবাদীদের দ্বারা বিকৃত। যুগে যুগে কালে কালে এমনকি এখনও আমরা দেখি ধর্মকে পুঁজি করে ভন্ডরা কী হীনমন্যভাবে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ষড়যন্ত্র হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে ’ইসলাম’ ধর্ম নিয়ে। অন্য ধর্মাবলম্বীরা তো আছেই, খোদ ’ইসলাম’ ধর্মের তথাকথিত অনুসারীদের দ্বারাও ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কারণ একদম সোজা, খাঁটি জিনিসেরই ভেজাল বেশি হয় ফালতু জিনিস কেউ ধরেও দেখে না। অথচ আমরা সৃষ্টির সেরা (!) হয়ে ফালতু জিনিসেই হাবুডুবু খাচ্ছি!
অসাড় বস্তু আর ভন্ডদের কাছে নিজেকে সমর্পিত করে আপনার কী উপকারটা হচ্ছে? বলবেন পরকালে স্বর্গ পাবো, হেভেন পাবো, জান্নাত পাবো ইত্যাদি। সবই তো ভবিষ্যত, বর্তমানে কী? বর্তমানে মুলা! তবে তো আমিও পারি একটি ধর্ম বানিয়ে কিংবা কোন ধর্মের প্রচারক সেজে পরকালের ভয় দেখিয়ে টু-পাইস কামিয়ে নিতে! আপনার পরকাল গোল্লায় যাক আমার হালুয়া-রুটি পেলেই হল! সারাবিশ্বে ধর্মের নামে এসবই তো চলছে, না আমি ভুল বলছি? সামান্য একটি চাকুরীতে ঢোকার আগে আপনি কত কি চিন্তা করেন-বেতন কী হবে, বোনাস কয়টা, চাকুরীর নিশ্চয়তা কী অথবা একটি ব্যবসা শুরুর আগে কতবার ভাবেন-মূলধন উঠবে তো, লাভ আসবে তো ইত্যাদি অথচ ধর্ম নিয়ে আপনার কোন চিন্তাই নেই। কারণ ধর্মবিদরা তো বলে দিয়েছেন ধর্মের ফলাফল সব ভবিষ্যতে। যেহেতু বর্তমানে মুলা অতএব মসজিদে আছি আবার পাপেও আছি, মন্দিরে আছি আবার ভন্ডামিতেও আছি, প্যাগোডায় আছি আবার হত্যায়ও আছি, গির্জায় আছি আবার নষ্টামিতেও আছি! যে ধর্মের কোন বর্তমান ফলাফল নেই সে ধর্মে থেকে লাভ কী?

”এবং ডাকিও না আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে, নাই কোন ইলাহ তিনি (আল্লাহ) ব্যতীত” (সূরা ক্বাসাস, আয়াত: ৮৮)।
যদি আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ না থাকে তবে বাকিরা যেমন- ভগবান, ঈশ্বর, গড ইত্যাদি কোত্থেকে এল? এগুলো কি মানুষের বানানো নাকি সত্যিই এদের কোন অস্তিত্ব আছে? যদি অস্তিত্ব থাকতো তবে তো ডাকলে সাড়া পাওয়া যেত। বাস্তবেও দেখা যায় কতগুলো অসাড় ও জড় বস্তুর (মূর্তি, পাথর ইত্যাদি) সম্মুখে মানুষ নত হয়ে আছে। তাদের দাবি ভগবান, ঈশ্বর, গড নাকি এসব মূর্তি এবং পাথরের মাঝে ভাস্বর হয়ে উঠেন! আমি আগেই বলেছি মানুষ নিয়েই সবকিছু। মানুষ নেই ধর্মও নেই। মানুষ বাদ দিয়ে ভগবান, ঈশ্বর, গড কেন কতগুলো পুতুল এবং পাথরের মাঝে ভাস্বর হয়ে উঠবেন আমার মাথায় আসে না। সহজেই বুঝা যায় এগুলো সবই ধান্ধাবাজদের আবিষ্কার। কোরআনে আছে,
”তারপর যখন তাকে সুসংবদ্ধ করলেন এবং আমরা তার মধ্যে আবরণমুক্ত করলাম আমার রূহ হতে (যা দেয়া হয়েছে তা) সুতরাং তখন তার জন্য সেজদাকারী হতে বললাম” (সূরা হিজর, আয়াত: ২৯)।
’আমরা তার মধ্যে আবরণমুক্ত করলাম আমার রূহ হতে’ অর্থাৎ মহান আল্লাহ মানুষের মধ্যে তাঁর রূহ সঞ্চার করে তাঁকে (মানুষকে) সবার সেরা করলেন। সেরা না হলে তাঁকে সেজদা দেবে কে? এখানে সেজদা মানে মাথা নত করা নয়, আত্মসমর্পণ। পাঠক একটু গভীর ভাবে চিন্তা করুন, সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং সম্মুখে থেকেও নিজেকে সেজদা না করে করতে বললেন নিজের নির্বাচিত সৃষ্টিকে তাঁর অন্যান্য সৃষ্টিদের যারা আকারে আদলে নির্বাচিত সৃষ্টির মতোই! কেন? কারণ সৃষ্টিকর্তা অসীম। তাঁকে ধরা, ছোঁয়া তো দূরের কথা কল্পনায়ও আনা সম্ভব নয়। আমরা (মানুষেরা) সৃষ্টি এবং সসীম। সসীমের মাঝেই তাঁকে খুঁজে নিতে হবে। সসীমের মাঝেই তিনি তাঁর রূহ তাঁর রহস্য সঞ্চার করে দিয়েছেন। এর বেশি কিছু আমি আর বলব না। যদি জানতে চান তবে আমার মতো ধ্যানের পথে আসুন তাঁর একজন নির্বাচিত সৃষ্টির নিকট আত্মসমর্পণ করে। আর জানতে না চাইলে চাকর/ব্যবসায়ী/স্বাবলম্বী হয়ে খেয়ে-পরে-মরে চতুষ্পাদ প্রাণীর মতো জীবন কাটিয়ে দিন। না ফেরার জগতে যেয়ে যখন চরম আফসোস করবেন তখন তাদের ডাক দিয়েন যারা স্বর্গ আর বেহেশতের কথা বলে আপনাদের পকেট খালি করেছিল, হুর-পরীদের লোভ দেখিয়ে যোদ্ধা বানিয়েছিল, পাথরের পূজো করিয়ে বোকা বানিয়েছিল।
অতীতে পথহারা মানুষেরা শ্রীকৃষ্ণ, গৌতম বুদ্ধ, হযরত ঈসা-মুসার কাছে আত্মসমর্পণ করে পথের দিশা পেয়েছিল যদিও তাঁরা (শ্রীকৃষ্ণ, গৌতম বুদ্ধ, হযরত ঈসা-মুসা) তাদেরই মতো মানুষ ছিলেন কিন্তু আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ আর বর্তমানে তাঁদের মূর্তির সম্মুখে মাথা নত করে যাবতীয় অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে! কারণ সত্য পথের সন্ধান পায়নি। অসাড় বস্তু কখনো সত্যের সন্ধান দিতে পারে না। শ্রীকৃষ্ণ কিংবা গৌতম বুদ্ধ কিংবা হযরত ঈসা-মুসা আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ ছিলেন যেভাবে জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ছিলেন। জর্জ ওয়াশিংটন এখন অতীত কারণ তিনি মৃত কিন্তু ’রাষ্ট্রপতি’ পদটি এখনো বর্তমান। রাষ্ট্রপতি কখনো মরতে পারে না কারণ রাষ্ট্রপতি কোন ব্যক্তি নয় এটি একটি পদবী। শ্রীকৃষ্ণ কিংবা গৌতম বুদ্ধ কিংবা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মৃত্যুবরণ করতে পারেন কিন্তু ’রসূল’ এখনো বর্তমান কারণ ’রসূল’ কোন ব্যক্তি নয় এটি একটি পদবী। যতদিন পৃথিবীর লীলাখেলা চলবে ততদিন রাষ্ট্রপতিও থাকবেন, রসূলও থাকবেন পথহারা মানুষদের সত্যের সন্ধান দেয়ার জন্য। রাষ্ট্রের ভারসাম্যের জন্য যেমন রাষ্ট্রপতির প্রয়োজন তেমনি পৃথিবী ও মানুষের মনোরাজ্যের ভারসাম্যের জন্য রসূলের প্রয়োজন। রসূলের পরিচয় যে পায়নি সে শত-কোটিবার আল্লাহকে ডাকতে পারে কিন্তু সাড়া পাওয়ার আশা দূরাশা বৈ আর কিছু নয় অথচ মহান আল্লাহ বলছেন,
”আমাকে ডাক, তোমাদের জন্য আমি সাড়া দিব” (সূরা মু’মীন, আয়াত: ৬০)।
অনেকে হয়ত বলতে পারেন আমরা সাড়া না পেলেও অমুক-তমুক ডেকে সাড়া পেয়েছিলেন। অমুক-তমুক ডেকে সাড়া পেয়েছিলেন কি পান নাই এটা জেনে আমার কোন লাভ নেই। আমাকে দেখতে হবে আমি ডেকে সাড়া পাচ্ছি কিনা। যেহেতু কথাটি মহান আল্লাহর যে ডাকলে তিনি সাড়া দেবেন অতএব এতে কোন সন্দেহ নেই। আপনি ডাকছেন কিন্তু সাড়া পাচ্ছেন না এতে আল্লাহর কোন দোষ নেই, দোষ আপনার। আরবী ’উদউনি’ এর বাংলা হচ্ছে ’আমাকে একা ডাক’। দু’জন হলে হবে ’উদউনা’। ’আমাকে ডাক, তোমাদের জন্য আমি সাড়া দিব’ আয়াতটিতে আছে ’উদউনি’ অর্থাৎ ’আমাকে একা ডাক’। আপনার সাথে কিন্তু আরেকজন সবসময় আছে আর সে হচ্ছে মানুষের আদি শত্রু নাম ’শয়তান’। যতক্ষণ সে আপনার সাথে আছে ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি ’উদউনা’ আর ’উদউনা’ অবস্থায় জীবনভর আল্লাহকে ডাকতে পারেন কিন্তু সাড়া কস্মিনকালেও আসবে না। তো উপায়? উপায় একটাই, রসূলের দ্বারস্থ হওয়া। কারণ রসূলের সাহচর্য মানে আল্লাহরই সাহচর্য। আর রসূলের সাহচর্য গ্রহণ করলে শয়তান পালাতে বাধ্য কারণ শয়তান আল্লাহ মানে কিন্তু রসূল মানে না যেভাবে সে আদমকে মেনে নেয়নি। শয়তান পালালে আপনি একা অর্থাৎ ’উদউনি’। এবার আল্লাহকে ডাক দিন তখন দেখবেন আমার রব কতই না দয়ালু। শয়তানের স্লোগান হল ’আল্লাহকে ছাড়া আর কিছু মানি না’। মজার ব্যাপার হল স্লোগানটি কিন্তু ইদানিং বেশ জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে!

যেহেতু সর্বপ্রকার ভন্ডামো বাতিল তাই আপনাকে (যারা ইসলামিক নাম ধারণ করে নিজেকে ইসলাম ধর্মের লোক ভাবছেন তাদেরকে সহ বলছি) ’ইসলাম’-এর ছায়াতলে আসার আহবান জানাচ্ছি। ’ইসলাম’-এর সারাংশ একটি বাক্যের মধ্যেই নিহিত আর তা হল,
”নেই কোন ইলাহ আল্লাহ ব্যতীত এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসূল”।
শুধু উচ্চারণ কিংবা কথায় নয় বাস্তবেও আপনাকে জেনে যেতে হবে যে আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসূল। আমি অধম যদি এর বাস্তব প্রমাণ পেতে পারি আপনার জন্য বাধা কোথায়? এখন নিশ্চয় জানতে চাইবেন আমার প্রমাণের সত্যতা কী। একটি পুরোনো উদাহরণ দেয়া যাক। বায়ু দেখা যায় না সত্য কিন্তু আমরা সবাই জানি বায়ুর ওজন আছে। প্রমাণ করতে হলে দরকার একটি বেলুন এবং পরিমাপক যন্ত্র। বায়ুশূন্য বেলুন এবং বায়ুভর্তি বেলুন পরিমাপক যন্ত্রে মেপে দেখুন দেখা যাবে বায়ুভর্তি বেলুনটি ওজনে বেশি। প্রমাণ করতে যাবো বায়ুর ওজন দরকার হল আরো দুটো জিনিসের (বেলুন এবং পরিমাপক যন্ত্র)। আল্লাহ এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর বাস্তবতা প্রমাণের জন্যও আরেকজনের দরকার আর তিনি হলেন রসূল (বর্তমানে মুর্শিদ, মুহসীন, মু’মীন, সালেহীন, মুত্তাকী, ওলিআল্লাহ)।

মানবজাতির উত্থান একই উৎস থেকে, দ্বিতীয় কোন উৎস নেই থাকতে পারেনা। আর উৎসটি হলেন আল্লাহ। যেহেতু উৎস একমাত্র আল্লাহ তাই ধর্মও একটি আর তা হল ’ইসলাম’। অনেকে হয়ত মানতে চাইবে না। মৃত্যুর পর সব রহস্য প্রকাশ হয়ে যাবে কিন্তু তখন সত্যটি দেখেও কোন লাভ হবে না। কারণ মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা থেকে আর কাউকে মর্ত্যরে জগতে ফেরত পাঠানো হবেনা। যা জানার যা বুঝার যা দেখার যা অনুভব করার সব এখানেই। অতএব মসজিদে যেয়ে নামাযে দাঁড়ানোর আগে, মন্দিরে যেয়ে পূজো দেয়ার আগে, প্যাগোডায় যেয়ে আরাধনার আগে, গির্জায় যেয়ে প্রার্থনার আগে জেনে নিন আসলেই আপনি সত্যের পথে আছেন না প্রলোভনের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন।

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম এবং সকল মানবজাতির প্রতি – ৪র্থ পর্ব

বিজ্ঞানীরা একটি আনুমানিক হিসাব দিলেও আমরা আসলেই জানি না এ বিশাল ব্রহ্মান্ডের প্রারম্ভ কবে থেকে। বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনাকালে আমরা কেউ পশ্চিমে আর কেউ ঊর্ধ্বমুখী থাকি অথচ আমরা জানি না আসলেই এ মহাজগতে কোন দিক (উত্তর-দক্ষিন-পূর্ব-পশ্চিম) কিংবা ঊর্ধ্ব-অধঃ বলে কিছু আছে কিনা। তবে অনেক কোরআন ব্যাখ্যাকারগণ কয়েকটি আয়াতের উদাহরণ দিয়ে পবিত্র কোরআনে পূর্ব-পশ্চিম আবিষ্কার করে ফেলেন! যেমন নিম্নের আয়াতগুলো,
”আমি শপথ করে বলছি যে অগণিত উদয়াচল এবং অগণিত অস্তাচল সমূহের রব” (সূরা মা’আরিজ, আয়াত: ৪০),
”দু’টি উদয়াচলের রব এবং দু’টি অস্তাচলের রব” (সূরা আর-রাহমান, আয়াত: ১৭),
”উদয়াচল এবং অস্তাচল আল্লাহরই জন্য” (সূরা বাকারা, আয়াত: ১১৫)।
আরবী ’মাশরিক’ এবং ’মাগরিব’ কে প্রায় তাফসীরকারক ’পূর্ব’ এবং ’পশ্চিম’ অনুবাদ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে মহাজগতের মতো পৃথিবীরও কোন দিক নেই। পৃথিবীতে বসবাস এবং চলাচলের সুবিধার্থে আমরা বিভিন্ন দিক তথা উত্তর-দক্ষিন-পূর্ব-পশ্চিম বানিয়ে নিয়েছি। একটু খেয়াল করুন, আসলে আমাকে নিয়েই উত্তর-দক্ষিন-পূর্ব-পশ্চিম। আমি স্থান পরিবর্তন করলে আমার দিকও পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। অতীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান আজকের মত এত উন্নত ছিল না তাই এ তিনটি আয়াতের ব্যাখ্যায় কোরআন ব্যাখ্যাকারগণ জগাখিচুড়ি মার্কা ধারণা দিয়ে দায় সেরেছেন। যেহেতু পবিত্র কোরআন একই সাথে জাগতিক, আধ্যাত্মিক এবং অসীমের জ্ঞানে ভরপুর একটি পবিত্র গ্রন্থ তাই জাগতিক ভাবে মেনে নিতে হচ্ছে উদয়াচল (অর্থাৎ যেদিক হতে সূর্য উদয় হয়) হল পূর্ব দিক এবং অস্তাচল (অর্থাৎ যেদিকে সূর্য অস্ত যায়) হল পশ্চিম দিক। এখন প্রশ্ন আসতে পারে অগণিত/দু’টি/একটি উদয়াচল এবং অগণিত/দু’টি/একটি অস্তাচলের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা কী? আমি ওদিকে আর যাচ্ছি না কারণ বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হলে আরেকটি লেখার প্রয়োজন হবে এবং বিষয়টি উচ্চস্তরের আধ্যাত্মিক ব্যাপার যা বলতে গেলে শরীয়তের গন্ডির বাইরে যেতে হবে যা এখানে বলা শোভন মনে করছি না।
এত বড় বড় গ্রহ-নক্ষত্র গুলো মহাশূন্যে ভেসে আছে হাজার হাজার বছর, কেউ একটুও এদিক-ওদিক হচ্ছে না। আর তাই বিশ্বজগতের প্রতিপালকের অপর নাম ’ভাসমান’ (’সুবহানআল্লাহ’-এর ’সুবহান’ অর্থ ভাসমান)। একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন দেখবেন আমরা সবাই আসলে ভাসমান। শূন্য থেকে ভেসে ভেসে এ ভবে এসেছি আবার শূন্যেই ভেসে যাবো। অথচ আমাদের কত প্রচেষ্টা নিজেকে মূর্ত করে রাখার জন্য! বিমূর্ত থেকে মূর্তে এসেই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি মূর্তির আরাধনায়! কেউ পাথর দিয়ে বানিয়ে আর কেউ নিজের ভেতরেই অসংখ্য মূর্তি যেমন-কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য্য, হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদি পালন করে! নামে ধর্ম পালন আসলে ভন্ডামি। একবারও চিন্তা করলেন না যে এ পাথরের প্রার্থনালয়গুলোতে গিয়ে আপনার কী উপকারটা হচ্ছে? পৃথিবীর আদিতে কয়টা মন্দির-বিহার-গির্জা-মসজিদ ছিল এবং বর্তমানে এগুলোর সংখ্যা কতগুলো। অবশ্যই বেড়েছে কিন্তু পাপাচার, অন্যায়-অত্যাচার ইত্যাদি কি কমেছে? মনে করবেন না আমি আবার প্রার্থনালয়ের বিরুদ্ধে বলে এগুলোতে কর্মরতদের ভাত মারার চেষ্টায় আছি। সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে বাস করতে হলে প্রার্থনালয়ের প্রয়োজন আছে। তবে তার আগে নিজেকে একবার আয়নায় দেখুন তো। আপনার ভেতরে যে অসংখ্য মূর্তি (যেমন-কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা ইত্যাদি) বিরাজ করছে সেগুলো কি দেখা যায়? যায় না। যায় না বলেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ’কাবা’ নামক প্রার্থনালয়ে ধ্যান না করে করতে গেলেন জাবালে নূর পর্বতের ৮৫০ ফুট উঁচুতে হেরা নামক নির্জন গুহায় আমাদের শিক্ষা দিতে যে নিজেকে অর্থাৎ নিজের ভেতরকে চিনতে কিংবা জানতে হলে লোকালয় বা কোলাহল মার্কা প্রার্থনালয়ে না যেয়ে আগে যেতে হবে নির্জনে। আবার মহান আল্লাহ কোরআন পাঠালেন সেই হেরা গুহাতেই, ’কাবা’তে নয়। এই যে ধ্যান সাধনা এটি কিন্তু নতুন নয়। যুগ যুগ ধরেই বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট হতে আগমন করা সকল অবতারগণ, রসূলগণ এই ধ্যান শিক্ষা আমাদের দিয়ে গেছেন। মহাদেব, বুদ্ধ, মুসা, ঈসা সবাই ধ্যান সাধনা করেছেন। বর্তমানে আমরা ধ্যান সাধনা বাদ দিয়ে লোক দেখানো ’যোগ দিবস’ কিংবা কোয়ান্টাম মেথডের ’মেডিটেশন’ পালন করে কৃত্রিম শান্তি অন্বেষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছি।
আমি আগেই বলেছি যা আপনাকে সৃষ্টিতে আবদ্ধ রাখে তাই ধর্ম। এ সূত্রে এ পৃথিবীতে সবাই আমরা ধার্মিক, নাস্তিকরা সহ। বিশ্বজগতের প্রতিপালক এ ধরণীতে আগে মানুষ পাঠিয়েছেন, ধর্ম নয়। তাঁর প্রথম সৃষ্টিও কিন্তু ’ধর্ম’ নয়। তবে কেন ধর্ম নিয়ে এত বাড়াবাড়ি, এত সংঘাত, এত সংশয়? ধর্ম মানুষই চেয়েছে নিজের প্রয়োজনে নইলে এ পৃথিবীতে বসবাসের বিচারে তার সাথে একটি চতুষ্পাদ প্রাণীর কোন পার্থক্য নেই। আবার এ পৃথিবীতে ধর্মের বিধি-বিধানও প্রচার হয়েছে মানুষের মাধ্যমে, অলৌকিক ভাবে আসমান থেকে কোন বিধানপত্র নাযিল হয়নি। পবিত্র কোরআনে আছে,
”এবং আমরা পাঠিয়েছি আপনার আগে (রসূল হিসেবে) একমাত্র মানুষ(ই)” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৭)।
সুতরাং মানুষ নিয়েই সবকিছু। মানুষ নেই ধর্মও নেই। তাই ধর্ম বুঝতে কিংবা ধর্মের বিধি-বিধান মানতেও মানুষের কাছেই যেতে হবে, বই কিংবা গ্রন্থের কাছে নয়। আবার যে-সে মানুষের কাছে গেলে হবে না। ধোকায় পড়ে নিজে তো বিপদে পড়বেনই আরেকজনকেও বিপদে ফেলবেন। এখন বড় প্রশ্ন হল কার কাছে কিংবা কোন ধর্মের কাছে যাবেন? সবাই তো সুন্দর সুন্দর কথা বলে। দল ভারী করার জন্য হরেক রকমের টোপ ফেলে নিজের আখের গুছিয়ে সহজ-সরল মানুষগুলোকে কানাগলিতে পাঠিয়ে দেয়, যেমন- স্বর্গের আরাম নরকের ভয়, ছোওয়াব কিংবা ফায়দার রমরমা ব্যবসা, পাপমুক্তির কথা বলে নর ভক্তদের পকেট কাটা আর নারী ভক্তদের ইজ্জত লুট, আলেম কিংবা বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ কিংবা গুরুজী-সাইজী কিংবা ঠাকুর-বাবা সেজে মানুষের মন যোগানো কথাবার্তা বলে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি, আদার ব্যাপারীর ’ফাদার’ সেজে ঈশ্বরপুত্র আবিষ্কার, কঠিন চীবরের নামে লালসালুতে নিজেকে আবদ্ধ করে মধ্যযুগে ফিরে যাওয়া ইত্যাদি।
আমি কোন দলে নেই আর তাই সুন্দর সুন্দর কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যা সত্য, সুন্দর এবং নিজের কাছে প্রমাণিত তাই আমি এ যাবৎ বলে এসেছি, বলছি এবং ইনশাআল্লাহ বলব। বর্তমান সময়টা হচ্ছে ধর্ম প্রচারের রমরমা সময়। যে যেভাবে পারছে বুঝে কিংবা না বুঝে ধর্ম প্রচারে ব্যস্ত। ফেসবুকে, মিডিয়ায়, রাস্তায়, ছাপাখানায়, রাজনীতির ডেরায় সর্বত্র ধর্মের প্রচার। সবাই প্রচারক। এদের থামানের জন্য পবিত্র কোরআনের নিম্নের আয়াতটি আমি যথেষ্ট বলে মনে করি,
”ওহে ঈমানদারেরা, রক্ষা করো নিজেকে এবং স্বজনদের আগুন থেকে” (সূরা তাহরীম, আয়াত: ৬)।
ভাল করে আয়াতটি লক্ষ্য করুন। বলা হয়েছে আগে নিজেকে নরকের আগুন থেকে রক্ষা করতে তারপর নিজের আপনজনদের। বুকে হাত দিয়ে বলতে বলুন তো তথাকথিত ধর্ম প্রচারকদের যে কারা কারা নরকের আগুন থেকে মুক্তি পেয়েছে। দেখবেন কেউ নেই। নেই মসজিদের ইমাম কিংবা মুয়াজ্জিন, মন্দিরের পুরোহিত, বিহারের ভান্তে, গির্জার পাদ্রী। নিজেরই ঠিক নেই আবার আসে ধর্ম প্রচার করতে! আরো খেয়াল করুন, আয়াতটি ’ঈমানদারদের’ উদ্দেশ্যে করে বলা হয়েছে, মানুষদের নয়। সবাই মানুষ কিন্তু সবাই ঈমানদার নয়। আমি আগেই বলেছি কলেমা তাইয়্যেবা পাঠ করলে কিংবা অন্তঃকরণে বিশ্বাস করলেই ঈমানদার হওয়া যায় না। জমি আছে যার তাকে বলা হয় জমিদার। অপরের জমির দলিল রাত-দিন মুখস্থ করতে পারেন কিন্তু জীবনেও জমিদার হওয়া যাবে না। জমি কিনতে টাকা লাগে। আবার টাকা দিয়ে জমি কিনে বসে থাকলেও হবে না। নির্ধারিত ভূমি কার্যালয়ে যেয়ে জমির যাবতীয় কাগজ-পত্র নিজের অধীনে আনতে পারলে তবেই জমিদার। পৃথিবীর সামান্য একটুকরো জায়গা নিজের অধীনে আনতে হলে কত কী করতে হয় আর আপনি অপরের মুখ থেকে শুনে কিংবা বই থেকে কলেমা তাইয়্যেবা পাঠ করে রাতারাতি ’ঈমানদার’ হওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখছেন? প্রিয় পাঠক এসব ভ্রান্ত চিন্তা আগে করে থাকলেও এখন মন-মগজ থেকে ঝেড়ে ফেলুন। আগুন থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে ’মানুষ’ পদবী থেকে উন্নীত হয়ে ’ঈমানদার’ হতে হবে। আর ঈমানের অধিকারী হতে হলে তাঁদের কাছেই আপনাকে যেতে হবে যাঁদের কাছে ঈমান সংরক্ষিত আছে। প্রশ্ন হল তাঁরা কাঁরা?

[চলবে]

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম এবং সকল মানবজাতির প্রতি – ৩য় পর্ব

[এ পর্বটি পড়ার পূর্বে অবশ্যই ১ম ও ২য় পর্বগুলো পড়ে নেবেন। না পড়ে না বুঝে সমালোচনা করে দয়া করে নিজেকে ছোট করবেন না।]
যুগে যুগে ধর্ম প্রচারের জন্য যেসব মহাপুরুষরা এসেছিলেন তাঁরা আসলে কোন ধর্মটি প্রচার করেছেন? আমি আগেই বলেছি দর্শনের প্রশ্নে চারটি ধর্ম একটি স্থানেই দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে ধর্মগুলোর নাম ভিন্ন ভিন্ন হলো কেন? নাম তো একটিই থাকার কথা। প্রথমে হিন্দুধর্মের কথা ধরা যাক। ’হিন্দু’ বলে আসলে কোন ধর্ম নেই, ’সনাতন’ ধর্মই হল হিন্দুধর্ম। ’সিন্ধু’ পরবর্তীতে ’হিন্দু’ অঞ্চলে এ সনাতন ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এর নাম হয় হিন্দু। ইতিহাস চর্চা বাদ দিয়ে বাস্তবে আসি। হিন্দুধর্মের দর্শন কী বলে দেখা যাক-

১. ঈশ্বরের অস্তিত্বেই সকল কিছুর অস্তিত্ব এবং সকল কিছুর মূলেই স্বয়ং ঈশ্বর,

২. জীবনের উদ্দেশ্য হল আত্মা ও ব্রহ্মের অভিন্নতা অনুভব করা, আত্মা সর্বশেষে পরমাত্মা ব্রহ্মে বিলীন হয়,

৩. আত্মাকে যিনি ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন রূপে অনুভব করতে সক্ষম হন তিনিই মোক্ষ বা মহামুক্তি লাভ করেন, আত্মা ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল এবং মোক্ষ নির্ভরশীল ঈশ্বরের প্রতি প্রেম অথবা ঈশ্বরের অনুগ্রহের উপর আর মোক্ষ লাভের পথ হল বিভিন্ন ধরনের যোগ বা ধ্যান সাধনা,

৪. রাম ও কৃষ্ণ বিষ্ণুরই অবতার।

এবার আমরা বৌদ্ধ ধর্মে আলোকপাত করব। বৌদ্ধ ধর্ম দুটি প্রধান মতবাদে বিভক্ত। প্রধান অংশটি হচ্ছে হীনযান বা থেরবাদ আর দ্বিতীয়টি মহাযান নামে পরিচিত। বৌদ্ধধর্মের দর্শন কী বলে দেখা যাক-

১. উদ্ভাসিত আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং পরম জ্ঞানকে বোধি বলা হয় আর এগুলো অর্জন করতে হলে তপস্যা বা ধ্যান আবশ্যিক,

২. সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য- এটাকে নির্বাণ বলা হয়,

৩. পরকাল নির্ভর করে মানুষের ইহ জন্মের কর্মের উপর,

৪. যে সাধনা অভ্যাস দ্বারা সত্য লাভ হয়, আধ্যাত্মিকতার পূর্ণ বিকাশ হয় তাই ধর্ম।

খ্রিস্টান আর ইহুদীদের ব্যাপারে কোরআন থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি,

”নিশ্চয়ই যারা ঈমানদার এবং যারা ইহুদি এবং নাসারা (খ্রিস্টান) এবং সাবেইন যারা ঈমানের কাজ করে আল্লাহর সঙ্গে এবং আখেরাতকালের সঙ্গে এবং সৎকাজ করে তবে তাদের জন্য তাদের রবের নিকট পুরস্কার রয়েছে (সূরা বাকারা, আয়াত: ৬২ ও সূরা মায়িদা, আয়াত: ৬৯)।

এবার আসি ইসলাম ধর্মে। এ ধর্মের সারাংশ একটি বাক্যের মধ্যেই নিহিত আর তা হল,

”নেই কোন ইলাহ আল্লাহ ব্যতীত এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসূল”।

বাক্যটিকে আরবীতে ’কলেমা তাইয়্যেবা’ অর্থাৎ পবিত্র বাক্য বলা হয়। অধিকাংশ জন মনে করেন কলেমা তাইয়্যেবা পাঠ করলে কিংবা অন্তঃকরণে বিশ্বাস করলেই ঈমানদার হওয়া যায়। বহুল প্রচলিত একটি ভুল মতবাদ। বাক্যটি শুধুমাত্র পাঠ কিংবা অন্তঃকরণে বিশ্বাস করার বিষয় নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে আসবে।

পবিত্র বাক্যটির প্রথম অংশটি হল ’নেই কোন ইলাহ আল্লাহ ব্যতীত’। একটু ভালভাবে লক্ষ্য করুন তো হিন্দু দর্শনের প্রথম বাক্যটির সাথে সাযুজ্য পান কিনা। পরের অংশটি হল ’মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসূল’। রাম ও কৃষ্ণ বিষ্ণুরই অবতার।

’আত্মা সর্বশেষে পরমাত্মা ব্রহ্মে বিলীন হয়’ কিংবা ’সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য’ এ দু’টোর সাথে-

”নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী” (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৬) আয়াতটির মিল নেই?

আবার পবিত্র কোরআনে আছে,

”এবং মনে করিও না তারা মৃত, যারা আল্লাহর পথে কতল হয়। বরং তারা জীবিত রবের নিকট রেজেকপ্রাপ্ত” (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৬৯),

”ওহে ঈমানদারগণ তাকওয়া কর আল্লাহর নিরেট তাকওয়া এবং তোমরা মৃত্যুবরণ করিও না আত্মসমর্পিত না হয়ে” (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১০২),

আয়াতদ্বয়ের সাথে বৌদ্ধধর্মের দর্শন ’উদ্ভাসিত আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং পরম জ্ঞানকে বোধি বলা হয়’ এবং হিন্দু ধর্মের দর্শন ’আত্মাকে যিনি ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন রূপে অনুভব করতে সক্ষম হন তিনিই মোক্ষ বা মহামুক্তি লাভ করেন’ – এর সামঞ্জস্য নেই?

হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্ম হল বিশ্বের মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ধর্ম। এরপর আসে ইহুদী আর খ্রিস্টান ধর্ম। প্রত্যেক ধর্মেই দেখা যাচ্ছে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট হতে একজন প্রতিনিধি এসে মানুষদের ধর্ম কিংবা মানুষের প্রভুর পরিচয় দান করেছেন যাঁদেরকে আমরা অবতার কিংবা কৃষ্ণ বিংবা বুদ্ধ কিংবা রসূল বলি। পবিত্র কোরআনে আছে,

”এবং রসূলগণ যাঁদের কথা আপনার নিকট পূর্বেই বর্ণনা করেছি এবং (আরও) রসূলগণ যাঁদের কথা আপনার নিকট বর্ণনা করিনি …, রসূলগণ হলেন সুসংবাদদাতা এবং সাবধানকারী যেন মানুষের জন্য আল্লাহর উপর কোনও বিতর্ক না থাকে রসূলগণের প্রত্যাগমনের পরেও” (সূরা নেসা, আয়াত: ১৬৪-১৬৫)।

যেহেতু দেখা যাচ্ছে প্রত্যেক ধর্মের দর্শন অভিন্ন এবং প্রত্যেক ধর্মেই বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট সমর্পিত হতে উপদেশ দেয়া হচ্ছে সুতরাং ধর্ম আসলে একটাই আর সেটা হল নিজেকে প্রভুর নিকট সমর্পণ করা। যাকে বলা হয় আত্মসমর্পণ বা সমর্পিত হওয়া আর এর আরবী হচ্ছে ইসলাম, হিন্দুতে মোক্ষ, বৌদ্ধতে নির্বাণ, ইহুদী আর খ্রিস্টানদের কথা তো কোরআনেই আছে তবে শর্ত হল ঈমানের সাথে সৎকাজ করতে হবে। তাই যারা বলে পূর্বের সব ধর্ম বাতিল তারা কি আসলেই সঠিক বলছে? যদি বাতিল হয়ে যায় তবে পূর্বে আগমন করা সকল অবতারগণ, রসূলগণ যে মিথ্যা হয়ে যায়। মিথ্যা হয়ে যায় কৃষ্ণ, বুদ্ধ, আদম, নূহ, মুসা, ঈসা। পবিত্র কোরআনে আছে,

”আজ আমি তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম তোমাদের ধর্মকে এবং আমার অনুগ্রহ তোমাদের প্রতি পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকেই তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম ধর্ম” (সূরা মায়েদা, আয়াত: ৩)।

আয়াতটি ভাল করে লক্ষ্য করুন। বলা হয়েছে ’তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম তোমাদের ধর্মকে’ বলা হয়নি আগের গুলো বাতিল করে তোমাদেরটি রাখলাম। ’সম্পূর্ণ করে দিলাম’ অর্থাৎ যা এতদিন অসম্পূর্ণ ছিল সেটাকেই পূর্ণ করার কথা বলা হচ্ছে। বাতিল করা নয়। সুতরাং এতকাল ধরে ধর্ম আসলে একটিই ছিল কিন্তু অসম্পূর্ণ। আয়াতটিতে আরেকটি রহস্যময় বিষয়ের প্রতি সামান্য আলোকপাত করতে চাই আর তা হল, বলা হয়েছে ’তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম তোমাদের ধর্মকে’ বলা হয়নি তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিলাম আমার (অর্থাৎ প্রভুর) ধর্মকে। বুঝা যাচ্ছে বিশ্বজগতের প্রতিপালক সব রকম ধর্মের ঊর্ধ্বে। কিন্তু তাঁকে পেতে হলে সমর্পিত হতে হবেই। তাই তিনি বলেন, আত্মসমর্পণই ধর্ম। ’ইসলাম’ শব্দটিকে আমরা একটি ধর্মের নামের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি কিন্তু ধর্ম অর্থই হল ইসলাম (আরবীতে) অর্থাৎ আত্মসমর্পণ।

তবে কি সব ধর্মই যার যার স্থানে ঠিক আছে এবং যে কেউ যেকোন একটি ধর্ম পালন করলেই হয়ে যাবে? মোটেই না। [চলবে]

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম এবং সকল মানবজাতির প্রতি – ২য় পর্ব

[লেখাটি লিখতে আমাকে প্রধান চারটি ধর্মের গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করতে হয়েছে যদিও ধর্মের সংখ্যা আরো অনেক তবে আমার মনে হয়েছে বাকি গুলো প্রধান চারটি ধর্মেরই শাখা-প্রশাখা। কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ এটি খুঁজতে যাওয়া আমার লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমি বুঝাতে চেষ্টা করব ধর্ম আসলে কী, কেন ধর্ম আমাদের প্রয়োজন এবং আমাদের ধর্ম কোনটি।]
কোন ধর্ম বা ধার্মিকের সমালোচনা আমার উদ্দেশ্য নয়। ধর্মের ইতিহাস চর্চার পথেও আমি যাবো না। আমি শুধু সত্য এবং বাস্তবতাটি তুলে ধরতে চাই বিবেকের চৌহদ্দিতে আঘাত করে।
পৃথিবীতে যদি ৭০০ কোটি মানুষ থাকে তবে ৭০০ কোটি মানুষের ৭০০ কোটি ধর্ম। একেক মানুষের আকাঙ্ক্ষা একেক রকম। যাকে স্বভাব ধর্ম বলে। আবার মৌলিক চাহিদার প্রশ্নে সব মানুষ এক। ক্ষুধা সবার লাগে এবং সবার খেতে হয়। ধর্ম সেটাই যেটা আপনাকে সৃষ্টিতে আবদ্ধ রাখে। প্রতিদিন আপনার একেক রকম ইচ্ছে মনে উদয় হয়। যদি আমার একটি বাড়ি হত, যদি আমি শ্রেষ্ঠ বক্তা হতে পারতাম, যদি আমার অনেক টাকা হত ইত্যাদি। এই যে ইচ্ছে গুলো এবং ক্ষুধা-তৃষা যা প্রতিদিন আপনাকে তাড়িয়ে বেড়ায়; প্রত্যেকটি একেকটি ধর্ম। এখানে একটি পশুর সাথে আপনার কোন পার্থক্য নেই। পশুরও ক্ষুধা লাগে, ইচ্ছে জাগে। মরে যাবেন জেনেও এ ধর্মের কারণে পারলে পুরো পৃথিবীর জায়গা আপনার কিনে নিতে ইচ্ছে জাগে! মরে যাবেন জেনেও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে খুব কষ্ট হয়।  আবার প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি মাসে বা প্রতি বছরে যেসব আচার কিংবা রীতি পালন করছেন বিভিন্ন ধর্মের নামে সেটাও ধর্ম। এটি আবার পশুদের নেই। তাই এ ধর্ম পালন করে বা নিজেকে সঁপে দিয়ে বা এ ধর্মের রহস্য অবগত হয়ে আপনাকে প্রথম ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে হবে। তবেই আপনি গণ্য হবেন সৃষ্টির সেরা হিসেবে। তখন অন্য সব সৃষ্টি আপনার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেবে। কঠিন মনে হচ্ছে? বিস্তারিত বলছি।

প্রধান চারটি ধর্মের গ্রন্থ এবং দর্শন অধ্যয়নের পর আমার সারাংশ হল-

১. আত্মদর্শনের সাধনার মাধ্যমে ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠার কঠিন সমরে জয়লাভ করা,

২. সবকটি ধর্মেই মানবতার গান গাওয়া হয়েছে,

৩. পাপ-পুণ্যের ফলাফল আছে,

৪. কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন ইত্যাদি।

যেহেতু আমি একটি ধর্মের অনুসারী তাই আমাকে কথা বলতে হবে ঐ ধর্মের দর্শনকে ভিত্তি ধরে যদিও দর্শনের প্রশ্নে চারটি ধর্ম একটি স্থানেই দাঁড়িয়ে আছে। অথচ পবিত্র কোরআন বলছে,
”এবং যে অনুসন্ধান করে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম তা কখনো তার থেকে গ্রহণ করা হবে না” (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ৮৫)।
আয়াতটিতে বুঝা যাচ্ছে ’ইসলাম’ ব্যতীত আর কোন ধর্ম নেই। অনেক কোরআন ব্যাখ্যাকারগণ আয়াতটির ব্যাখ্যায় বলেছেন যে ’ইসলাম’ আসার পর পূর্বের সব ধর্ম বাতিল হয়ে গেছে! ভিন্ন ধর্মীরা বলবে তোমাদের আল্লাহ-ই তো অন্য সব ধর্ম বাতিল করে দিয়েছেন আয়াতটির মাধ্যমে সেখানে দর্শনের প্রশ্নে চারটি ধর্ম কীভাবে একটি স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে? আসলেই কি তাই? মনে রাখতে হবে বিশ্বজগতের প্রতিপালক কখনো সীমাবদ্ধতার দেয়ালে আবদ্ধ থাকেন না। তাঁর পৃথিবীতে সবাই সমান। আমরা মূর্খরা নিজ নিজ হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ধর্মে ধর্মে, দলে দলে, আকীদায় আকীদায়, বংশে বংশে, জাতিতে জাতিতে ভাগ হয়ে যাই। কূপমন্ডূক কীভাবে অসীমের জ্ঞানের মর্ম বুঝবে? আর তাই একবোঝা ভুল ভুল ব্যাখ্যা আর তাফসীরে ভরে রেখেছে কোরআন এবং বিকৃত করেছে অন্য ধর্মগ্রন্থগুলো। ভাগ্যিস আরবী কোরআনটি অবিকৃত আছে নইলে পৃথিবী বসবাস অযোগ্য হয়ে যেত।

আয়াতটির মর্ম বুঝার আগে আমাকে বুঝতে হবে ’ইসলাম’ শব্দের অর্থ কী। ’ইসলাম’ অর্থ আত্মসমর্পণ বা সমর্পিত হওয়া। কার কাছে? বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে। তিনি কে কিংবা তাঁর সম্পর্কে কোন ধারণা কিংবা তাঁর অস্তিত্বের কোন প্রমাণ কি আমার আছে? উত্তর আসবে ’না’। তো কীভাবে তাঁর কাছে সমর্পিত হবো যাকে দেখা দূরে থাক ন্যূনতম কোন ধারণাই নেই। সেজন্যই তিনি যুগে যুগে পাঠাচ্ছেন তাঁর খলীফা তথা প্রতিনিধি যাঁদের আমরা পাই ’অবতার’, ’নবী’, ’রসূল’, ’মুর্শিদ’ ইত্যাদি রূপে। ’অবতার’ শব্দটি দেখে ইসলাম ধর্মের ভাইয়েরা আবার অন্য ধর্মের শব্দ ভেবে ভয় পাবেন না। কোরআনের সূরা কাওসার-এর শেষ আয়াতের শেষ শব্দটি দেখুন। বাজারের প্রচলিত কোরআন তাফসীরগুলোতে ’অবতার’ শব্দটির অর্থ লিখেছে বিচ্ছিন্ন, নির্বংশ, লেজকাটা যার কোনটাই সূরাটির মূলভাব প্রকাশ করে না। কেন করে না তার ব্যাখ্যা সূরাটির সাথে সম্পর্কিত অন্য কোন লেখায় দেব ইনশাআল্লাহ। বিশ্বজগতের প্রতিপালক অসীম সত্তা। কেউ তাঁকে ডাকে আল্লাহ, কেউ ভগবান, কেউ ঈশ্বর ইত্যাদি। তাঁকে ধরা, ছোঁয়া না গেলেও অনুভব করা যায় তবে কারো মাধ্যমে যাঁদের আমরা পাই ’অবতার’, ’নবী’, ’রসূল’, ’মুর্শিদ’ ইত্যাদি রূপে। তবে ইসলাম ধর্মে বর্তমানে এমন কিছু দল বের হয়েছে যারা মাধ্যম মানতে একদম নারাজ। তারা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করতে চায় আর কারো কাছে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। বহু পূর্বে ’ইবলিশ’ নামক একজন ব্যক্তিও একই প্রকারের চেষ্টা করেছিলো ’আদম’কে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার জন্য কিন্তু অসফল এবং লাঞ্ছিত। বিশ্বজগতের পালনকর্তা এতবড় অসীম সত্তা হয়েও নিজেকে প্রকাশ করার জন্য আশ্রয় নিলেন মাধ্যমের যাঁদের আমরা পাই ’অবতার’, ’নবী’, ’রসূল’, ’মুর্শিদ’ ইত্যাদি রূপে। কেন নিলেন? তিনি তো অলৌকিক ভাবে আসমান থেকে পবিত্র গ্রন্থ পাঠিয়ে আমাদের বলতে পারতেন তোমরা ভাল করে আমার প্রেরিত গ্রন্থগুলো পড়ো আর আমার আরাধনা কর। সেটা না করে কেন এত এত ’অবতার’, ’নবী’, ’রসূল’, ’মুর্শিদ’ পাঠালেন এবং এখনো পাঠাচ্ছেন? বইয়ের পোকারা সেসব কি আর বুঝবে। মুখ আছে তাই জীবনভর প্রভুকে ডাকা যাবে কিন্তু সাড়া যে কখনো আসবে না। [চলবে]